কিশোরগঞ্জের বিস্তীর্ণ হাওরজুড়ে এখন শুধু পানি আর হতাশার ছবি। কয়েক দিনের আগাম বন্যায় পাকা বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ায় হাজারো কৃষক এক মৌসুমের সম্বল হারিয়েছেন। ঘরে ওঠার আগেই ফসল নষ্ট হওয়ায় অনেক পরিবার এখন খাদ্যসংকট, ঋণের চাপ ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে দাঁড়িয়ে আছে। কৃষকদের আশঙ্কা, এবার শুধু ফসলই নয়, তাদের জমি-গবাদিপশুও হারাতে হতে পারে ঋণ শোধের চাপে।
কিশোরগঞ্জ সদর থেকে নিকলী হাওরের দিকে গেলেই চোখে পড়ে পানিতে ডুবে থাকা বিস্তীর্ণ জমি। কোথাও শুধু গাছের মাথা দেখা যাচ্ছে, কোথাও কাটা ধান পানিতে পচে যাচ্ছে। হাওর এলাকার মানুষের জন্য বোরো ধানই বছরের প্রধান অবলম্বন। এই ধান বিক্রির টাকাতেই চলে সংসার, শোধ হয় ঋণ, সন্তানের পড়াশোনা ও চিকিৎসার খরচ মেটানো হয়। কিন্তু এবার সেই ফসল হারিয়ে পুরো অঞ্চলে নেমে এসেছে চরম দুশ্চিন্তা।
নিকলী উপজেলার এক নারী কৃষক জানান, ঋণ নিয়ে প্রায় ১০ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করেছিলেন। আশা ছিল ধান ঘরে তুলে দেনা শোধ করবেন এবং ঈদ সামনে রেখে পরিবারের জন্য কিছু স্বস্তি আসবে। কিন্তু হঠাৎ বন্যায় সব শেষ হয়ে গেছে। তাঁর ভাষায়, আর কিছুদিন পরে পানি এলে অন্তত কিছু ধান ঘরে তোলা যেত। এখন ঘরে খাবারের চালও থাকবে না।
হাওরের অধিকাংশ কৃষকের অবস্থাই প্রায় একই। কোথাও পাকা ধান পানির নিচে, কোথাও ভেজা ধান শুকাতে না পেরে নষ্ট হচ্ছে। কৃষকেরা বলছেন, ফসল রক্ষার শেষ চেষ্টাও ব্যর্থ হয়েছে। অনেকেই লোকসান জেনেও পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে ধান কাটার চেষ্টা করছেন, কারণ পুরোপুরি ফেলে দেওয়ার মতো মানসিক শক্তিও তাদের নেই।
নিকলীর এক কৃষক জানান, কিছু ধান ঘরে তুললেও সেগুলো ভিজে পচে গেছে। মাঠের ফসল হারানোর পর ঘরে থাকা সামান্য ধানও নষ্ট হওয়ায় পরিবার নিয়ে এখন চরম সংকটে আছেন তিনি।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীরা বলছেন, হাওরের কৃষি অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই ঋণনির্ভর। অধিকাংশ কৃষকের নিজস্ব পুঁজি না থাকায় মৌসুম শুরুর আগে ব্যাংক, এনজিও কিংবা স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিতে হয়। কিন্তু ব্যাংক ঋণ পেতে জটিল কাগজপত্র ও জামানতের প্রয়োজন হওয়ায় প্রান্তিক কৃষকেরা বেশি নির্ভর করেন মহাজনের ওপর। এসব ঋণের বিপরীতে পরে কম দামে ধান বিক্রি করে টাকা শোধ করতে হয়। এবার ফসলই না থাকায় সেই ঋণ এখন ভয়াবহ চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শাহপুর গ্রামের এক কৃষক বলেন, ২০ বিঘা জমির পুরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। স্থানীয় মহাজনের কাছ থেকে নেওয়া ঋণ কীভাবে শোধ করবেন, তা ভেবেই তিনি দিশেহারা। আরেক কৃষকের ভাষ্য, অধিকাংশ পরিবার এখন জমি বা গরু বিক্রি করে ঋণ শোধের কথা ভাবছে। এরপর আবার নতুন ঋণ নিয়ে পরের মৌসুমে চাষ করতে হবে। ফলে ঋণের এই চক্র থেকে বের হওয়ার সুযোগ খুব কম।
অনেক কৃষক অভিযোগ করছেন, ক্ষতির পরও বাজারে ভেজা ধানের দাম অত্যন্ত কম। একজন কৃষক জানান, তিনি শ্রমিককে দৈনিক প্রায় এক হাজার ২০০ টাকা মজুরি দিয়ে ধান কাটছেন, অথচ ভেজা ধানের মণ বিক্রি হচ্ছে প্রায় ৬০০ টাকায়। লোকসান নিশ্চিত জেনেও কিছু ধান তোলার চেষ্টা করছেন, কারণ সম্পূর্ণ ফসল হারানোর কষ্ট আরও বড়।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, অন্য জেলাগুলোতে সহায়তা কার্যক্রম শুরু হলেও কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে এখনও কার্যকর সহায়তা পৌঁছায়নি। এতে হতাশা বাড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, কিশোরগঞ্জে প্রায় ১৩ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন অন্তত ৫২ হাজার ৫০০ কৃষক। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরি করা হচ্ছে এবং জরুরি সহায়তা কয়েক দিনের মধ্যেই শুরু হবে। সরকারের পক্ষ থেকে খাদ্য সহায়তা তিন মাস পর্যন্ত চালু রাখার কথাও জানানো হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ত্রাণ দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক কর্মকর্তারা বলছেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা হবে ঋণ পরিশোধ। তাই ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ এবং সহজ কিস্তির ব্যবস্থা জরুরি হয়ে পড়েছে। অন্যথায় অনেক কৃষক আগামী মৌসুমে চাষাবাদ চালিয়ে যেতে পারবেন না।
হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা নতুন নয়। এর আগে ২০১৭ ও ২০২২ সালেও ভয়াবহ ফসলহানির ঘটনা ঘটেছিল। মাঝের দুই বছরে উৎপাদন ভালো হলেও কৃষকেরা ধানের ন্যায্যমূল্য পাননি। ফলে পুরোনো ক্ষতি কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। অনেক পরিবার আগের ঋণ শোধ করতে নতুন ঋণ নিয়েছে। এভাবেই বছরের পর বছর ঋণের বোঝা আরও ভারী হয়েছে।
পরিবেশ ও হাওর উন্নয়নকর্মীরা মনে করছেন, এবারের বিপর্যয়ের পেছনে শুধু প্রাকৃতিক কারণ নয়, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও দায়ী। তাদের মতে, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, খাল ও পানি নিষ্কাশন পথ ভরাট হয়ে যাওয়া, অকেজো স্লুইসগেট এবং জলাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শ্রমিক সংকট, ডিজেলের সমস্যা এবং যন্ত্র দিয়ে ধান কাটার সীমাবদ্ধতা। অনেক জমিতে পানি জমে থাকায় হারভেস্টার ব্যবহারই সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও হাওরাঞ্চলের কৃষিকে আরও ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। অল্প সময়ের বৃষ্টি এখন দ্রুত বন্যা তৈরি করছে। ফলে কৃষকেরা সময়মতো ফসল ঘরে তুলতে পারছেন না। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বল্পমেয়াদি উচ্চফলনশীল ধান, আধুনিক সেচব্যবস্থা, কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার এবং জলবায়ু সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার ও বিভিন্ন প্রকল্প।
কৃষি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, হাওরাঞ্চলে আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, সোলার সেচব্যবস্থা, পাইপলাইন সেচ এবং ভর্তুকিতে কৃষিযন্ত্র বিতরণের উদ্যোগ চলছে। লক্ষ্য হলো উৎপাদন ব্যয় কমানো, সময়মতো ধান কাটা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কৃষকদের সক্ষম করে তোলা।
তবে মাঠের বাস্তবতা বলছে, এই মুহূর্তে হাওরের কৃষকদের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন দ্রুত আর্থিক সহায়তা এবং ঋণের চাপ থেকে স্বস্তি। কারণ ফসল হারানোর পর তাদের সামনে এখন শুধু পানিতে ডোবা জমি নয়, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ভয়ও ভাসছে।

