গর্ভের সন্তানের ছেলে না মেয়ে—এই তথ্য প্রকাশকে মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থি উল্লেখ করে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, অনাগত শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ ও তা প্রকাশের প্রবণতা শুধু অনৈতিকই নয়, এটি নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি বৈষম্যকে উৎসাহিত করে এবং সামাজিক ভারসাম্য নষ্টের ঝুঁকি তৈরি করে।
বিচারপতি নাইমা হায়দার ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ২০২৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি এ রায় ঘোষণা করেন। সোমবার প্রকাশিত হয়েছে রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি।
রায়ে আদালত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন, ভ্রূণের লিঙ্গ প্রকাশের কারণে কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে বৈষম্য, নারী ভ্রূণ হত্যার আশঙ্কা এবং নারীর প্রতি নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আরও গভীর হতে পারে। আদালতের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ধরনের কার্যক্রম নারীর মর্যাদা, সমঅধিকার এবং জীবনের অধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
হাইকোর্ট বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দেশে এ বিষয়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির ঘাটতি রয়েছে। শুধু নীতিমালা তৈরি করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে কঠোর নজরদারি, জবাবদিহি ও প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিংয়ের মাধ্যমে।
রায়ে নিবন্ধিত হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে গর্ভকালীন পরীক্ষার তথ্য সংরক্ষণের জন্য কেন্দ্রীয় ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ছয় মাসের মধ্যে এই ডাটাবেজ তৈরি ও নিয়মিত হালনাগাদ করতে বলা হয়েছে।
আদালত পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেন, ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণের মাধ্যমে কন্যাশিশুর বিরুদ্ধে বৈষম্য তৈরি হয়, যা সংবিধানের ১৮, ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের মৌলিক নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদ ও নারী অধিকার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও এটি সাংঘর্ষিক বলে মত দেন বিচারকরা।
রায়ে আরও বলা হয়, ভারতসহ বিভিন্ন দেশে অনাগত শিশুর লিঙ্গ নির্ধারণ ও প্রকাশ আইনগতভাবে কঠোর নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রয়েছে। বাংলাদেশেও এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
আদালত এ নির্দেশনাকে “কনটিনিউয়াস ম্যান্ডামাস” হিসেবে ঘোষণা করেছেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতে নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি আদালত নিজেই তদারকি করতে পারবেন।
২০২০ সালের ২৬ জানুয়ারি সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান গর্ভের সন্তানের লিঙ্গ প্রকাশ বন্ধে রিট আবেদন দায়ের করেন। শুনানিতে তাকে সহযোগিতা করেন আইনজীবী তানজিলা রহমান। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল অমিত দাশ গুপ্ত।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রায় শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয়; বরং সমাজে কন্যাশিশুর মর্যাদা ও নারীর সমঅধিকার প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। তাদের ভাষ্য, প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমাতে এ রায় ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

