শহরকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করতে প্রতিবছর শত শত কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিটি করপোরেশন কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, সেই ব্যয়ের সুফল পৌঁছাচ্ছে না নাগরিকদের কাছে।
গত দুই অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ড্রেনেজ খাতে ব্যয় করেছে অন্তত এক হাজার ৩০০ কোটি টাকা। তবে বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ড্রেন থেকে তোলা ময়লা দিনের পর দিন পড়ে থাকছে রাস্তার পাশে। এর সঙ্গে যোগ হচ্ছে গৃহস্থালি বর্জ্য। আর এক পশলা বৃষ্টি নামলেই সেই বর্জ্য ধুয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে ড্রেনে। ফলে যে জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য এত ব্যয়, সেই একই চক্রেই ঘুরপাক খাচ্ছে রাজধানী।
গত রবিবার মোহাম্মদপুর, মিরপুর, উত্তরা, বনশ্রী ও রামপুরা এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ড্রেন থেকে তোলা কাদা, প্লাস্টিক বর্জ্য ও অন্যান্য আবর্জনা রাস্তার পাশে স্তূপ করে রাখা হয়েছে। একই জায়গায় রাখা হয়েছে বাসাবাড়ি থেকে সংগ্রহ করা ময়লাও। এতে কিছু এলাকায় রাস্তা সংকুচিত হয়ে যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন পথচারীরা, যারা দুর্গন্ধ এড়াতে নাকে রুমাল বা হাত চেপে চলাচল করছেন।
পরদিন সোমবার আবারও বৃষ্টির পর একই এলাকাগুলোতে দেখা যায় ভিন্ন চিত্র। বৃষ্টির পানিতে সেই স্তূপ করা বর্জ্য ধুয়ে আবার ড্রেনে চলে গেছে। এতে সড়কগুলো আবার জলমগ্ন হয়ে পড়ে। ড্রেন দিয়ে পানি নিষ্কাশনও হয় অত্যন্ত ধীরগতিতে। অল্প বৃষ্টিতেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় একই অবস্থা লক্ষ্য করা গেছে।
ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন, বছরের পর বছর ড্রেন পরিষ্কারের যে অভিযান চালানো হয়, তার বাস্তব সুফল কোথায়? স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবে কোটি কোটি টাকার ব্যয় কার্যত অপচয়ে পরিণত হচ্ছে। তাদের মতে, ড্রেন থেকে ময়লা তুলে দ্রুত ট্রাকে ভরে সরিয়ে নেওয়া হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, ময়লা দীর্ঘ সময় রাস্তায় পড়ে থাকছে। পরে তা শুকিয়ে ধুলোর সঙ্গে মিশে জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করছে।
নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে প্রতি বর্ষায় একই সংকট ফিরে আসে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল দখল ও ভরাট, অপর্যাপ্ত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতাকে তারা মূল কারণ হিসেবে দেখছেন। তাদের ভাষায়, এটি কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়, বরং ব্যবস্থাপনার বড় ব্যর্থতা। ড্রেন পরিষ্কারের চেয়ে জরুরি হলো দ্রুত বর্জ্য অপসারণ নিশ্চিত করা। তা না হলে পুরো উদ্যোগই অর্থহীন হয়ে পড়ে।
বনশ্রী এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “ময়লা কেউ সরায়নি। বৃষ্টি হলেই আবার ড্রেনে চলে যায়। তাহলে এত টাকা খরচ করে পরিষ্কার করার মানে কী? এক সপ্তাহ রাস্তার পাশে ময়লা পড়ে থাকলে আগের অবস্থাই ভালো ছিল।” মোহাম্মদপুরের রিকশাচালক রহমত আলী বলেন, “এই পচা ময়লা তিন দিন আগে রাস্তায় ফেলে রাখা হয়েছে। দুর্গন্ধে দাঁড়ানো যায় না। আজকের বৃষ্টিতে আবার সব ড্রেনে চলে গেছে।” নিকুঞ্জ এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ সোহেল বলেন, “প্রতি বছরই বলা হয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বৃষ্টি হলেই বাস্তবতা বোঝা যায়। পানি জমলে শুধু রাস্তা নয়, মানুষের স্বাভাবিক জীবনও থেমে যায়।”
ধানমণ্ডির রাসেল স্কয়ার থেকে গ্রিন রোড, পান্থকুঞ্জ পার্ক হয়ে সোনারগাঁও হোটেলের পেছন পর্যন্ত বিস্তৃত গ্রিন রোড–পান্থপথ বক্স কালভার্টেও একই চিত্র দেখা গেছে। ১৯৯৩ সালে নির্মিত এই প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ কালভার্টে আবর্জনা জমে আছে। আলাদা নিষ্কাশন লাইনের অভাবে বিভিন্ন বাসাবাড়ির কঠিন ও পয়োবর্জ্য হাতিরঝিলে গিয়ে পড়ছে। স্থানীয় আলমগীর হোসেন বলেন, “অল্প বৃষ্টিতেই হাঁটু পানি জমে যায়। প্রতি বছরই শুনি ড্রেনেজ ব্যবস্থা ঠিক করা হবে, কিন্তু বাস্তবে পরিবর্তন নেই।”
উত্তরার বিভিন্ন রাস্তায় ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে সরাসরি ঢাকনাবিহীন ড্রেনে ময়লা ফেলা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব অবৈধ দোকান উচ্ছেদে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। ১৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, “২০১৮ সাল থেকে নিয়মিত কর দিচ্ছি, কিন্তু সেবা পাচ্ছি না। ড্রেনেজ ব্যবস্থা খুবই খারাপ, অধিকাংশ ড্রেনের ঢাকনা নেই।”
৩ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা ও কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. নজরুল ইসলাম ভূঁইয়া বলেন, “ড্রেন সংস্কারের জন্য বারবার চিঠি দিয়েছি, কিন্তু কোনো ব্যবস্থা হয়নি। দ্রুত সংস্কার না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।” ১৭ নম্বর সেক্টরের ৪ নম্বর সড়কের বাসিন্দা হাফিজুর রহমান বলেন, “সড়ক ভাঙাচোরা, ড্রেন নেই। অল্প বৃষ্টিতেই পানি জমে যায়। এমনকি বৃষ্টি ছাড়াও অনেক সময় পানি জমে থাকে, চলাচল কঠিন হয়ে পড়ে।”
সিটি করপোরেশনের সমন্বয়হীনতার কারণে ড্রেন পরিষ্কার কার্যক্রম কার্যত ব্যর্থ হয়ে পড়ছে। চলতি মাসের শুরুতে বনশ্রী এ ব্লকে একদল পরিচ্ছন্নতাকর্মী ড্রেন পরিষ্কারের কাজ শুরু করেন। ড্রেনের ভেতর জমে থাকা বর্জ্য তুলে ম্যানহোলের পাশে রাখা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পরও সেই বর্জ্য আর সরানো হয়নি। প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এসব বর্জ্য একই স্থানে পড়ে থাকে। এর মধ্যেই কয়েক দফা বৃষ্টিতে সেই বর্জ্য পানির সঙ্গে মিশে আবার ড্রেনেই ফিরে যায়। ফলে পরিষ্কার করার পরও পরিস্থিতি আগের অবস্থাতেই ফিরে আসে।
ড্রেন পরিষ্কারের কাজে নিয়োজিত কর্মীদের অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি। তারা জানান, তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের অধীনে কাজ করেন এবং নির্দেশনার বাইরে মন্তব্য করার সুযোগ নেই। এক পরিচ্ছন্নতাকর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের কাজ ময়লা তোলা। কোথায় রাখা হবে বা কখন সরানো হবে, সেটা আমাদের দায়িত্ব না।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, এই বক্তব্যই পুরো সমস্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। তাদের অভিযোগ, সিটি করপোরেশন ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকায় পুরো ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ছে। স্থানীয় বাসিন্দা তরিকুল আলম বলেন, “এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ড্রেন পরিষ্কার করে ময়লা আবার রাস্তায় ফেলে রাখা হয়। পরে বৃষ্টি হলে সেগুলো আবার ড্রেনে ফিরে যায়। এরপর আবার নতুন করে পরিষ্কার দেখানো হয়। এটা যেন এক ধরনের চক্র।” আরেক বাসিন্দা রহমত উল্লাহ বলেন, “সিটি করপোরেশনের লোকজন কাজ করে ঠিকই, কিন্তু সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। একবার বৃষ্টি হলেই তোলা ময়লা আবার গর্তে ফিরে যায়। তাহলে এই কষ্ট করে ড্রেন পরিষ্কারের লাভ কী? এটা তো স্রেফ অর্থের অপচয়।”
শুধু বনশ্রী নয়, সেগুনবাগিচা, মতিঝিল, ফকিরাপুল, দিলকুশা, আরামবাগ ও বক্স কালভার্ট সড়ক ঘুরেও একই চিত্র পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় ড্রেন থেকে তোলা ময়লা দীর্ঘ সময় পড়ে থাকায় বৃষ্টির পানিতে আবার সড়ক ও ড্রেনে ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারের নিচ থেকে কাজলা পর্যন্ত সড়কে ড্রেনের ময়লা বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে পুরো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। এতে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি আশপাশের পরিবেশে তীব্র দুর্গন্ধ তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের মধ্যে সমন্বয় না থাকায় প্রতি বৃষ্টিতেই একই ধরনের দুর্ভোগের পুনরাবৃত্তি ঘটছে রাজধানীতে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে (২০২৪-২৫) শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনা খাতে ব্যয় হয়েছে অন্তত ৫০১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এর মধ্যে বেসরকারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৮৫ কোটি টাকা, খাল ও লেক উন্নয়নে ৩০ কোটি টাকা, বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ১৮ কোটি টাকা এবং খাল পরিষ্কারকরণে ১২ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে।
এ ছাড়া নর্দমা ও ড্রেন পরিষ্কারকরণে দুই কোটি টাকা, পাম্পহাউস মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ১১ কোটি টাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৪১ কোটি টাকা এবং সেকেন্ডারি বর্জ্য ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণে পাঁচ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। শুধু তাই নয়, আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে এককভাবে ব্যয় হয়েছে ২৬০ কোটি ১০ লাখ টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২৬) এই খাতে ব্যয় আরও বাড়ানো হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ৭৯৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বাজেট নির্ধারণ করেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বাস্তবে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
চলতি বাজেটে বেসরকারি বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ১২৬ কোটি টাকা, খাল ও লেক উন্নয়নে ৩৮ কোটি টাকা, বিশেষ পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে ২৫ কোটি টাকা এবং খাল পরিষ্কারকরণে ৩৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ড্রেনেজ মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণে ১০ কোটি টাকা, পাম্পহাউস রক্ষণাবেক্ষণে ১৫ কোটি টাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ১৭০ কোটি টাকা এবং সেকেন্ডারি বর্জ্য ট্রান্সফার স্টেশন নির্মাণে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া আমিনবাজার ল্যান্ডফিলের সম্প্রসারণ ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে চলতি অর্থবছরেও ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে নগর বিশ্লেষকদের প্রশ্ন, প্রতিবছর শত শত কোটি টাকা ব্যয়ের পরও কেন বর্ষা এলেই একই জলাবদ্ধতা ও বর্জ্য সংকট ফিরে আসে? তাদের মতে, শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন কার্যকর তদারকি, সমন্বিত ব্যবস্থাপনা এবং মাঠ পর্যায়ে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।
বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে প্রতিবছরই ঢাকা ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন ড্রেনেজ লাইন পরিষ্কারের কাজে কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে। তবে বাস্তবতা বলছে, জলাবদ্ধতার পুনরাবৃত্তি থামছে না। কারণ ড্রেন পরিষ্কারের পর উত্তোলিত বর্জ্য দ্রুত অপসারণ না হওয়ায় তা আবার ড্রেনে ফিরে যাচ্ছে। এতে পুরো কার্যক্রমের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাধারণ সম্পাদক ড. মু. মোসলেহ উদ্দীন হাসান বলেন, নগরের জলাবদ্ধতা কমাতে খালগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনা জরুরি। সরকার খাল পুনঃখনন কর্মসূচি হাতে নিলেও তা সমন্বিত নগর ও পরিবেশ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বাস্তবায়ন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত না করলে খাল রক্ষা ও জলাবদ্ধতা নিরসনে টেকসই ফল পাওয়া যাবে না।
নগর বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন মৌসুমি দুর্ভোগের সীমা ছাড়িয়ে নগর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তাদের মতে, একাধিক সংস্থা আলাদাভাবে কাজ করলেও কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে কোথাও ড্রেন নির্মাণ থাকলেও সংযোগ নেই, আবার কোথাও খাল খনন থাকলেও পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত থাকে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, খালের নিয়মিত পরিচর্যা না থাকায় অনেক জায়গায় অবৈধ দখল হয়েছে। কোথাও খালের মাঝখানে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে ঘর তৈরি করা হয়েছে, যা পানি চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে।
ডিএনসিসির সহকারী প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. আরাফাত হোসেন বলেন, খাল ও ড্রেনের ক্যাচপিট নিয়মিত পরিষ্কার করা হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর পানি প্রবাহ সচল রাখতে মাঠ পর্যায়ে কাজ চলছে। তবে তিনি জানান, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের উন্নয়নকাজের কারণে কুড়িল ও বিমানবন্দর সড়কের কিছু ড্রেনের মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।
মিরপুর এলাকার জলাবদ্ধতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মিরপুর একসময় নিচু জলাধার এলাকা ছিল, যেখানে আশপাশের পানি জমত। কিন্তু জলাধার ভরাট করে বসতি গড়ে ওঠায় স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি মেট্রোরেল নির্মাণকাজের সময় কিছু নিষ্কাশন লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সেগুলো এখনো পুরোপুরি মেরামত হয়নি।
দুই সিটি করপোরেশন মিলিয়ে রাজধানীতে মোট ১৪১টি জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ঢাকা উত্তরে ১০৮টি এবং দক্ষিণে ৩৩টি এলাকা রয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান বলেন, দক্ষিণ সিটির ১১০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় পানি নিষ্কাশনের জন্য মাত্র তিনটি আউটলেট রয়েছে, যেখানে প্রয়োজন অন্তত আটটি। বিশেষ করে পুরান ঢাকা, নিউমার্কেট ও ধানমণ্ডি এলাকায় কার্যকর আউটলেট নেই। তিনি জানান, দ্রুত পানি অপসারণের জন্য ১০টি পোর্টেবল পাম্প আনা হয়েছে। তাঁর দাবি, যন্ত্র সচল থাকলে ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে পানি সরানো সম্ভব।
অন্যদিকে এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ড্রেনেজ লাইন ওয়াসা ও দুই সিটি করপোরেশন যৌথভাবে পরিষ্কার করলেও ময়লা দ্রুত অপসারণ না হওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়। তবে তিনি স্বীকার করেন, মাঠ পর্যায়ে এখনো সমন্বয়ের ঘাটতি রয়েছে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা এখন আর শুধু মৌসুমি দুর্ভোগ নয়, এটি নগর ব্যবস্থাপনার এক দীর্ঘস্থায়ী ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ, শত শত প্রকল্প আর নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম—সবকিছুর পরও বৃষ্টি নামলেই যখন রাজধানী ডুবে যায়, তখন প্রশ্নটা আর কেবল ব্যয়ের নয়, বরং ব্যবস্থাপনার দায়বদ্ধতার হয়ে দাঁড়ায়।
ড্রেন পরিষ্কার হচ্ছে, কিন্তু বর্জ্য সরছে না। খাল খনন হচ্ছে, কিন্তু প্রবাহ ফিরছে না। সংস্থাগুলো কাজ করছে, কিন্তু সমন্বয় নেই। এই বিচ্ছিন্নতার মাঝেই প্রতিবার বর্ষায় একই দুর্ভোগে আটকে পড়ছে নগরবাসী।
ঢাকাকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে হলে প্রকল্প নয়, প্রয়োজন কার্যকর সমন্বয়, দ্রুত বাস্তবায়ন এবং কঠোর জবাবদিহি। না হলে কোটি কোটি টাকার ব্যয় শুধু হিসাবের খাতাতেই থাকবে, বাস্তবতায় নয়। সূত্র: কালের কন্ঠ
সিভি/এম

