দেশের অন্যতম বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র বাংলাদেশ-ইন্ডিয়া ফ্রেন্ডশিপ পাওয়ার কোম্পানি পরিচালিত রামপাল তাপবিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদন সচল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে ১ হাজার কোটি টাকা চেয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, দ্রুত অর্থ ছাড় না হলে কয়লা আমদানি, ঋণ পরিশোধ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন কার্যক্রম মারাত্মক চাপে পড়তে পারে।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড–এর চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রমানাথ পুজারি সতর্ক করেছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অর্থ না পেলে প্রতিষ্ঠানটি ঋণ খেলাপির ঝুঁকিতে পড়বে। একই সঙ্গে কয়লাবাহী জাহাজের ডেমারেজ চার্জ বাড়ার আশঙ্কাও রয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ঈদুল আজহার আগে ব্যাংকিং কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ার কারণে ২০ মে’র মধ্যে অর্থ ছাড় প্রয়োজন। কারণ ২৪ মে চলতি সময়ের শেষ কার্যদিবস হিসেবে ধরা হচ্ছে। অর্থ ছাড়ে বিলম্ব হলে কেন্দ্রটির আর্থিক ও পরিচালনাগত ব্যয় মেটানো কঠিন হয়ে পড়বে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ২৩৪ মেগাওয়াট নির্ভরযোগ্য সক্ষমতায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি বড় অংশ এই কেন্দ্র থেকে পূরণ হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে জাতীয় গ্রিডে কেন্দ্রটির অবদান ৮ থেকে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
কোম্পানির তথ্যমতে, প্রতিদিন কয়লা ব্যবহারে ব্যয় হচ্ছে প্রায় ২৪ থেকে ২৬ কোটি টাকা। এতে মাসিক কয়লা ব্যয় ৭০০ কোটি টাকার বেশি দাঁড়াচ্ছে। এর বাইরে ঋণের কিস্তি, কাস্টমস শুল্ক, যন্ত্রাংশ সংগ্রহ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়সহ অন্যান্য খাতে আরও প্রায় ৩০০ কোটি টাকা প্রয়োজন হচ্ছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রটির দাবি, সরবরাহ করা বিদ্যুতের বিপরীতে সরকারের কাছে বর্তমানে তাদের পাওনা এক হাজার কোটি টাকার বেশি। এই বকেয়া দ্রুত পরিশোধ না হলে উৎপাদন ধারাবাহিকতা ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, গ্রীষ্মকালীন উচ্চ চাহিদার সময় রামপালের মতো বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হলে জাতীয় গ্রিডে তাৎক্ষণিক চাপ তৈরি হবে। এতে লোডশেডিং বাড়তে পারে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যয়বহুল ডিজেল ও ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালাতে হতে পারে। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট ও লোডশেডিংয়ের অভিযোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস সংকট এবং আমদানি করা বিদ্যুতের ওপর চাপ বৃদ্ধির কারণে সামগ্রিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এর আগে গত মার্চ মাসেও কেন্দ্রটির পক্ষ থেকে ভারতের এক্সিম ব্যাংক থেকে নেওয়া ঋণের মূলধন পরিশোধে ৯০৩ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছিল। ওই অর্থ ৪০ মিলিয়ন ডলারের ঋণ পরিশোধের জন্য প্রয়োজন বলে জানানো হয়।
বিপিডিবির এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এপ্রিল শেষে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে সংস্থাটির বকেয়া প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে সরকারের ভর্তুকির অর্থ সময়মতো না পাওয়ায় এই অর্থ পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে।
অর্থ বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বিদ্যুৎ ভর্তুকির জন্য ৩৬ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে এপ্রিল পর্যন্ত প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ছাড় করা হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের মোট ভর্তুকি চাহিদা ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, ফলে বরাদ্দকৃত অর্থ দিয়ে পুরো বকেয়া মেটানো সম্ভব হবে না।
বিশ্লেষকদের মতে, বিদ্যুৎ খাতে বাড়তে থাকা ভর্তুকির চাপ, জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা এবং উৎপাদন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এখন সরকারের জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। রামপালের মতো বড় প্রকল্পে অর্থসংকট তৈরি হলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাও ঝুঁকিতে পড়তে পারে।

