জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া একাধিক মামলার তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য পেয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন। তদন্তকারীরা বলছেন, অনেক ঘটনায় গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, এমনকি জীবিত ব্যক্তিকেও হত্যা মামলার ভুক্তভোগী হিসেবে দেখানোর ঘটনা সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় অন্তত ১৪টি মামলাকে ভুয়া বলে শনাক্ত করেছে সংস্থাটি।
পিবিআই সূত্রে জানা গেছে, গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন আদালতে হওয়া ১৯৫টি সিআর মামলার তদন্ত করতে গিয়ে এসব অসঙ্গতি ধরা পড়ে। তদন্তে দেখা গেছে, ব্যক্তিগত শত্রুতা, রাজনৈতিক প্রতিশোধ কিংবা পারিবারিক বিরোধ মেটাতেই অনেক মামলা সাজানো হয়েছিল।
সংস্থাটির তথ্যমতে, শনাক্ত হওয়া ভুয়া মামলার মধ্যে ১০টি ছিল হত্যাচেষ্টা, তিনটি হামলা ও নির্যাতন এবং একটি হত্যা মামলা। এছাড়া আরও ১০টি মামলার অভিযোগের পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পায়নি তদন্তকারী কর্মকর্তারা।
পিবিআইয়ের একাধিক তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, কিছু ঘটনায় আহত হওয়ার যে দাবি করা হয়েছিল, বাস্তবে তার সঙ্গে আন্দোলন বা সংঘর্ষের কোনো সম্পর্ক ছিল না। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের একটি মামলায় এক শিক্ষার্থীর গুলিবিদ্ধ হওয়ার অভিযোগ আনা হয় স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, ওই শিক্ষার্থী আসলে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়েছিল। চিকিৎসা নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য এবং কল রেকর্ড বিশ্লেষণ করে এই তথ্য নিশ্চিত হয়।
তদন্তকারীরা আরও জানতে পারেন, ওই মামলার পেছনে স্থানীয় রাজনৈতিক বিরোধ ও পাল্টাপাল্টি মামলার বিষয় জড়িত ছিল। এক পক্ষের করা মামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবেই পরে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আরেক ঘটনায় রাজধানীর উত্তরা এলাকায় এক তরুণকে নিহত দেখিয়ে হত্যা মামলা করা হয়। মামলায় দাবি করা হয়েছিল, আন্দোলনের সময় তিনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান এবং তার মরদেহ খুঁজে পাওয়া যায়নি। কিন্তু তদন্তে দেখা যায়, ওই ব্যক্তি জীবিত আছেন এবং পরবর্তীতে অন্য একটি মামলায় তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছিল।
পিবিআই বলছে, এসব মামলার কারণে নির্দোষ ব্যক্তিরা ব্যাপক হয়রানির শিকার হয়েছেন। অনেককে সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতির মুখেও পড়তে হয়েছে। তদন্ত শেষে যেসব মামলায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি, সেগুলোতে আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আবেদন করা হয়েছে।
এ পর্যন্ত তদন্ত শেষ হওয়া ১১৩টি মামলার মধ্যে ৮৯টির অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। এসব মামলায় মোট প্রায় সাত হাজার মানুষকে আসামি করা হলেও তদন্ত শেষে অল্প সংখ্যক ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, অনেক মামলায় নির্বিচারে বিপুলসংখ্যক মানুষের নাম যুক্ত করা হয়েছিল।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, মিথ্যা মামলা শুধু বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, বরং প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথও জটিল করে তোলে। এ ধরনের ঘটনায় দণ্ডবিধির ২১১ ধারায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আইনে মিথ্যা ফৌজদারি মামলা দায়েরের জন্য কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান আছে। গুরুতর অভিযোগে শাস্তির মাত্রা আরও বেশি হতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর একটি মহল ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নেওয়ার উপায় হিসেবে এসব মামলাকে ব্যবহার করেছে। তাদের মতে, যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই, তাদের উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে, যা বিচারব্যবস্থার অপব্যবহারের শামিল।
বিশ্লেষকদের মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান ঘিরে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে হলে একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগ শনাক্ত করাও জরুরি। অন্যথায় বিচারপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

