দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা ও সেশনজট থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে নতুন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। আগামী বছর মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের দুই গুরুত্বপূর্ণ পাবলিক পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি ঘোষণা করে শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানিয়েছেন, এসএসসি পরীক্ষা আগামী বছরের জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে এবং এইচএসসি পরীক্ষা জুন মাসে আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বুধবার (১৩ মে) গাজীপুরের বোর্ড বাজারে অবস্থিত ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজিতে আয়োজিত ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই তথ্য জানান।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, করোনা মহামারিসহ গত কয়েক বছরের নানা সংকট দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় ধরনের সেশনজট তৈরি করেছে। সেই জট কাটিয়ে শিক্ষাবর্ষকে আবারও নিয়মিত ধারায় ফিরিয়ে আনতে ধাপে ধাপে কাজ করছে সরকার। তার ভাষায়, শুধু পরীক্ষা নেওয়াই লক্ষ্য নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষা পরিবেশ নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ।
সরকার প্রথমে ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজনের একটি পরিকল্পনা বিবেচনায় নিয়েছিল। তবে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মতামত বিশ্লেষণ করে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কারণ অনেকের আশঙ্কা ছিল, স্বাভাবিক সময়সূচিতে দ্রুত ফিরে যেতে গিয়ে হঠাৎ করে সময় কমিয়ে দিলে শিক্ষার্থীরা বড় চাপের মুখে পড়তে পারে। এতে শিখন ঘাটতি তৈরি হওয়ারও ঝুঁকি ছিল।
শিক্ষামন্ত্রী স্পষ্টভাবে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত নিতে চায় না যাতে শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে বা তাদের ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই নতুন সময়সূচি নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, মহামারির পর দেশের শিক্ষা খাতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে সেশনজট। দীর্ঘ সময় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা, সংক্ষিপ্ত সিলেবাস, বিলম্বিত পরীক্ষা এবং ভর্তি কার্যক্রমে ধীরগতির কারণে পুরো একাডেমিক ক্যালেন্ডার এলোমেলো হয়ে যায়। এর প্রভাব শুধু স্কুল-কলেজেই সীমাবদ্ধ ছিল না, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও এর বড় প্রভাব পড়ে।
এ কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন পুরো ব্যবস্থাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানোর কৌশল নিয়েছে। মন্ত্রণালয়ের লক্ষ্য হচ্ছে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে আবারও নির্ধারিত সময়ে সব পাবলিক পরীক্ষা আয়োজন করা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক কার্যক্রমও নিয়মিত ধারায় ফিরিয়ে আনা।
শিক্ষামন্ত্রী জানান, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর একাডেমিক ক্যালেন্ডারও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবর্ষ ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। এতে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের ভর্তি ও ফল প্রকাশ কার্যক্রমেও গতি আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই দিনে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে একটি মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে অংশ নেওয়া অধিকাংশ শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবক ডিসেম্বরে এসএসসি পরীক্ষা আয়োজনের বিরোধিতা করেন। তাদের মতে, মাত্র এক বছরে চার মাস সময় কমিয়ে ফেললে শিক্ষার্থীদের ওপর অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হবে।
অনেক শিক্ষক মনে করছেন, শুধু পরীক্ষার সময় এগিয়ে আনলেই শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়ন হবে না। বরং পাঠদান, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক প্রস্তুতির বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্থিতিশীল করতে হলে পরিকল্পিত ও ধীরগতির সংস্কার প্রয়োজন। হঠাৎ করে সময়সূচি পরিবর্তন করলে শিক্ষার্থীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে। তাই সরকার যে এবার মতামতের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে হাঁটছে, সেটিকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন অনেকে।
সব মিলিয়ে, আগামী বছরের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সম্ভাব্য সময়সূচি নিয়ে সরকারের এই নতুন পরিকল্পনা শিক্ষার্থীদের জন্য কিছুটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। এখন সবার নজর থাকবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চূড়ান্ত ঘোষণার দিকে এবং কীভাবে ধাপে ধাপে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনা যায়, সেদিকেই।

