বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত এখন এমন এক আর্থিক চাপের মুখে দাঁড়িয়ে আছে, যার শিকড় অনেক আগের নীতিগত সিদ্ধান্তে। শেখ হাসিনার দেড় দশকের শাসনামলে বেসরকারি খাতে প্রায় ১০০টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের লাইসেন্স দেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে মাত্র একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র দরপত্রের মাধ্যমে অনুমোদন পেয়েছিল। তবে সেখানেও প্রকৃত প্রতিযোগিতা ছিল না, কারণ অংশ নিয়েছিল মাত্র একটি কোম্পানি। বাকি কেন্দ্রগুলো অনুমোদন পেয়েছিল অযাচিত প্রস্তাবের ভিত্তিতে।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, প্রতিযোগিতা ছাড়া যখন বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন দেওয়া হয়, তখন প্রকল্প ব্যয়, বিদ্যুতের দাম এবং ক্যাপাসিটি চার্জ কতটা যৌক্তিকভাবে নির্ধারিত হয়। এখন সেই প্রশ্নই আরও বড় হয়ে সামনে এসেছে। কারণ আগের সময়ের চুক্তিগুলোর আর্থিক দায় এখন বর্তমান ও পরবর্তী সরকারগুলোর ওপর এসে পড়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছর থেকে চলতি অর্থবছর শেষ পর্যন্ত ১৭ বছরে বেসরকারি খাতের রেন্টাল, কুইক রেন্টাল এবং স্বাধীন বিদ্যুৎ উৎপাদক কেন্দ্রগুলোর ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ মোট পরিশোধ দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ১১ হাজার ১৮৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এই অঙ্ক শুধু বড় নয়, বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত চাপেরও। কারণ ক্যাপাসিটি চার্জ এমন এক ধরনের ব্যয়, যেখানে অনেক সময় বিদ্যুৎ পুরোপুরি ব্যবহার না করলেও কেন্দ্রের সক্ষমতার জন্য অর্থ দিতে হয়।
চলতি অর্থবছরে এই খাতে ব্যয় আরও ভয়াবহ আকার নিচ্ছে। পিডিবির হিসাব অনুযায়ী, এ বছর ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করতে হবে ৪২ হাজার ৬১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। গত অর্থবছর এই ব্যয় ছিল ৩৫ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানেই বড় ধরনের বৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, হাসিনা সরকারের প্রথম ১০ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ তুলনামূলকভাবে কম ছিল। এর একটি কারণ ছিল তখন বেশিরভাগ বিদ্যুৎকেন্দ্রের আকার ছোট। পাশাপাশি ডলারের বিনিময় হারও তুলনামূলক স্থিতিশীল ছিল। ফলে ক্যাপাসিটি চার্জ দ্রুত বাড়েনি। কিন্তু ২০১৮-১৯ অর্থবছরের পর থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
২০০৯-১০ অর্থবছরে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছিল মাত্র ১ হাজার ৭৯০ কোটি ২০ লাখ টাকা। অথচ চলতি অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়াচ্ছে ৪২ হাজার ৬১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ ১৬ বছরের ব্যবধানে এই ব্যয় প্রায় ২৪ গুণ বেড়েছে। আবার ২০১৮-১৯ অর্থবছরের তুলনায় বর্তমান ক্যাপাসিটি চার্জ প্রায় ৫ গুণ।
এই বৃদ্ধির পেছনে কয়েকটি বড় কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, বেসরকারি খাতে বড় আকারের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ধাপে ধাপে উৎপাদনে এসেছে। দ্বিতীয়ত, বড় কয়লাভিত্তিক ও এলএনজিভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু হওয়ায় সক্ষমতা বেড়েছে। তৃতীয়ত, ডলারের বিনিময় হার বেড়ে যাওয়ায় চুক্তিভিত্তিক অর্থপ্রদানের চাপ আরও বেড়েছে।
২০০৯-১০ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৫০ হাজার ৫৪৯ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। কিন্তু ২০১৯-২০ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত পরের ৫ বছরেই এই ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮২ হাজার ৮২৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, সর্বশেষ দুই অর্থবছরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও বিএনপি সরকারকে মিলিয়ে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হচ্ছে ৭৭ হাজার ৮০৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।
বছরভিত্তিক তথ্য দেখলে চাপের মাত্রা আরও স্পষ্ট হয়। ২০১০-১১ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ২ হাজার ৭৮৩ কোটি ৫৬ লাখ টাকা। ২০১১-১২ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৫ হাজার ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ৫ হাজার ৪৯০ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। এরপর ২০১৩-১৪ অর্থবছরে তা কমে ৪ হাজার ৭১৪ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং ২০১৪-১৫ অর্থবছরে হয় ৪ হাজার ৬৬৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
তবে ২০১৫-১৬ অর্থবছর থেকে আবার ব্যয় বাড়তে থাকে। ওই অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ ছিল ৫ হাজার ৩৭৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে তা হয় ৫ হাজার ৭৬৪ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ব্যয় দাঁড়ায় ৬ হাজার ২৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। এরপর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে তা বেড়ে হয় ৮ হাজার ৭২২ কোটি ২৭ লাখ টাকা।
পরবর্তী সময়ে বড় বেসরকারি কেন্দ্রগুলো উৎপাদন শুরু করায় ব্যয়ের গতি আরও বাড়ে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ ১১ হাজার কোটি টাকার কাছাকাছি পৌঁছে ১০ হাজার ৮৫২ কোটি ৭৮ লাখ টাকা হয়। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ২১ কোটি ৩ লাখ টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যয় হয় ১৩ হাজার ৭০০ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে পরিস্থিতি আরও বদলে যায়। পায়রাসহ কয়েকটি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোদমে উৎপাদনে আসে। ফলে ওই অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয় ১৭ হাজার ৭৮৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে চাপ আরও বাড়ে। আদানি, এসএস পাওয়ারসহ বড় কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসার পাশাপাশি সামিট, ইউনিকসহ বেশ কিছু এলএনজিচালিত কেন্দ্রও চালু হয়। এর ফলে ক্যাপাসিটি চার্জ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে দাঁড়ায় ২৭ হাজার ৪৬৫ কোটি ১৪ লাখ টাকা।
এখানে বড় সমস্যা হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও সেই সক্ষমতার পুরোটা সব সময় ব্যবহৃত হয় না। কিন্তু চুক্তির কারণে কেন্দ্রগুলোকে নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়। ফলে বিদ্যুৎ খাতে উৎপাদন পরিকল্পনা, চাহিদা নির্ধারণ এবং চুক্তির কাঠামো—সবকিছু নিয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
হাসিনা সরকারের পতনের পর বিদ্যুৎ খাতের দুর্নীতি অনুসন্ধান, আদানির চুক্তি বাতিল এবং বিভিন্ন ব্যয়বহুল চুক্তি পর্যালোচনার দাবি জোরালো হয়েছিল। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তা কার্যকরভাবে করতে পারেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। ফলে ক্যাপাসিটি চার্জের লাগাম টানা যায়নি।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই ব্যয় রেকর্ড ৩৫ হাজার ১৮৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকায় পৌঁছায়। জাতীয় নির্বাচনের পর বিএনপি সরকারও আগের চুক্তিগুলো বহাল রাখে। ফলে চলতি অর্থবছরে ক্যাপাসিটি চার্জ আরও বেড়ে ৪২ হাজার ৬১৮ কোটি ২৮ লাখ টাকায় দাঁড়াচ্ছে।
সরকার ইতিমধ্যে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর ট্যারিফ বা বিদ্যুতের দাম পর্যালোচনার জন্য কমিটি করেছে। তবে এই উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ চুক্তি পর্যালোচনা করতে হলে শুধু বর্তমান দাম দেখা যথেষ্ট নয়। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রকৃত উৎপাদন ব্যয়, বিনিয়োগের কাঠামো, ডলারের বিনিময় হার, জ্বালানির দাম এবং চুক্তির শর্ত—সবকিছুই বিশ্লেষণ করতে হবে।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন ব্যয় আসলে কতটা বেশি ধরা হয়েছে, সে বিষয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ সমীক্ষা হয়নি। ফলে শুধু ট্যারিফ পর্যালোচনা করলেই যে সমস্যার সমাধান হবে, তা নিশ্চিত নয়।
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে বিদ্যুৎ খাতে স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র, চাহিদাভিত্তিক পরিকল্পনা এবং পুরনো চুক্তির ন্যায্য পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। শুধু উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ালেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; সেই সক্ষমতা অর্থনীতির জন্য টেকসই কি না, সেটিও বড় প্রশ্ন।
বর্তমান বাস্তবতা দেখাচ্ছে, বিদ্যুৎ খাতে ভুল পরিকল্পনা ও অস্বচ্ছ চুক্তির প্রভাব এক বা দুই বছরের মধ্যে শেষ হয় না। এর দায় বহু বছর ধরে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি, ভোক্তা এবং পরবর্তী সরকারগুলোকে বহন করতে হয়। তাই ক্যাপাসিটি চার্জ এখন শুধু বিদ্যুৎ খাতের হিসাব নয়; এটি বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনারও বড় পরীক্ষা।

