বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ অবকাঠামো যমুনা সেতুকে আরও প্রশস্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ক্রমবর্ধমান যানবাহনের চাপ সামাল দিতে সেতুটির প্রস্থ আরও ৩ দশমিক ৫ মিটার বাড়ানো হবে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ এবং চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত নির্মাণ প্রতিষ্ঠান চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের মধ্যে একটি চুক্তি সই হয়েছে।
বুধবার (১৩ মে) বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের কার্যালয়ে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য অংশের যোগাযোগ আরও গতিশীল করতে এই প্রকল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
কেন প্রয়োজন হচ্ছে সম্প্রসারণ?
যমুনা সেতু নির্মাণের সময় এতে রেল ও সড়ক—দুই ধরনের চলাচলের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তবে বর্তমানে যমুনা নদীর ওপর পৃথক রেলসেতু চালু হওয়ায় আগের রেলপথ ব্যবহৃত হচ্ছে না। ফলে সেই পরিত্যক্ত অংশকে মূল সড়কের সঙ্গে যুক্ত করে সেতুর প্রস্থ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, পণ্য পরিবহন এবং আন্তঃজেলা যাতায়াত বেড়ে যাওয়ায় যমুনা সেতুর ওপর চাপও কয়েকগুণ বেড়েছে। বিশেষ করে ঈদ, উৎসব কিংবা কৃষিপণ্য পরিবহনের মৌসুমে এই সেতুতে দীর্ঘ যানজট এখন প্রায় নিয়মিত চিত্র। তাই দীর্ঘমেয়াদে চাপ সামাল দিতে সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
কী বলছেন কর্মকর্তারা?
চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের পক্ষে প্রধান প্রকৌশলী কাজী মুহাম্মদ ফেরদৌস এবং চীনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ওয়াং বেনকিয়ান স্বাক্ষর করেন।
অনুষ্ঠান শেষে সেতু কর্তৃপক্ষের পরিচালক আলতাফ হোসেন শেখ বলেন, সেতুর ওপর যানবাহনের চাপ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তাই সেতুর ধারণক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি এর দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করাও এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি জানান, উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় গুণগত মান বজায় রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে। কারণ যমুনা সেতু শুধু একটি সেতুই নয়, এটি দেশের অন্যতম কৌশলগত মহাসড়ক সংযোগ।
অর্থনীতিতে কী প্রভাব পড়তে পারে?
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে যমুনা সেতু বাংলাদেশের অন্যতম প্রাণরেখা। উত্তরাঞ্চলের কৃষিপণ্য, শিল্পপণ্য এবং বিভিন্ন বাণিজ্যিক মালামাল প্রতিদিন এই সেতু ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছায়। ফলে সেতুতে যানজট বা ধীরগতি পুরো সরবরাহ ব্যবস্থাকেই প্রভাবিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেতুর প্রস্থ বাড়ানো হলে যান চলাচলের গতি বাড়বে, সময় কম লাগবে এবং পণ্য পরিবহন ব্যয়ও কিছুটা কমতে পারে। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য আরও গতিশীল হবে।
এ ছাড়া দীর্ঘমেয়াদে এই প্রকল্প উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক কার্যক্রমেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ দ্রুত যোগাযোগ ব্যবস্থা বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সামনে কী চ্যালেঞ্জ?
তবে অবকাঠামো বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু সেতু প্রশস্ত করলেই পুরো সমস্যার সমাধান হবে না। সেতুর দুই প্রান্তের সংযোগ সড়ক, টোল ব্যবস্থাপনা এবং যানবাহন নিয়ন্ত্রণেও আধুনিক পরিকল্পনা প্রয়োজন। না হলে যানজটের বড় অংশ অন্য জায়গায় স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
তারপরও যমুনা সেতু সম্প্রসারণকে দেশের যোগাযোগব্যবস্থার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ভবিষ্যতের বাড়তি যানবাহনের চাপ মাথায় রেখে এখন থেকেই অবকাঠামো উন্নয়নকে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত বলে মনে করা হচ্ছে।

