দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্ণফুলী পানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ইউনিট সংস্কারে অর্থায়নের আগ্রহ দেখিয়েছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা। দীর্ঘ সাত বছর ধরে ক্রয়সংক্রান্ত জটিলতায় আটকে থাকা এই প্রকল্প আবারও এগোতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও কেন্দ্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, জাইকার সহায়তায় কেন্দ্রটির ৪ ও ৫ নম্বর ইউনিটের পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য নতুন প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে। গত বছরের মাঝামাঝি সময় থেকে জাইকার একাধিক প্রতিনিধি দল কাপ্তাইয়ের কেন্দ্রটি পরিদর্শন করে প্রযুক্তিগত ও আর্থিক বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মো. মাহমুদ হাসান জানিয়েছেন, ইউনিট দুটি এখন পূর্ণাঙ্গ ওভারহল বা বড় ধরনের সংস্কারের অপেক্ষায় রয়েছে।
কেন্দ্রের নথিপত্র বলছে, ৪ নম্বর ইউনিট সর্বশেষ সংস্কার করা হয়েছিল ২০১০ সালের জুনে এবং ৫ নম্বর ইউনিট ২০১১ সালের এপ্রিলে। অথচ সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী প্রতি ১০ বছর পর একটি ইউনিটের বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন হয়।
দীর্ঘদিন প্রয়োজনীয় সংস্কার না হওয়ায় ইউনিট দুটির উৎপাদন সক্ষমতা কমে গেছে। প্রতিটি ইউনিটের সক্ষমতা ৫০ মেগাওয়াট হলেও বর্তমানে সেগুলো থেকে সর্বোচ্চ ৪০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে। এতে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন প্রায় ২০ মেগাওয়াট কমে গেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইউনিট দুটির জেনারেটর বহনকারী ধাতব কাঠামোয় ফাটল দেখা দিয়েছে। ফলে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও অস্থায়ী মেরামতের মাধ্যমে সেগুলো সচল রাখা হচ্ছে। প্রতি সপ্তাহে এসব কাঠামো পরীক্ষা করা হয়। প্রয়োজন হলে ওয়েল্ডিংয়ের কাজও করা হয়। কখনও কখনও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ইউনিট বন্ধ রাখতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, কাঠামোগত দুর্বলতা আরও বড় ধরনের যান্ত্রিক জটিলতার কারণ হতে পারে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জাপানি প্রতিষ্ঠান তোশিবার একটি বিশেষজ্ঞ দল ২০২৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি থেকে ৭ মার্চ পর্যন্ত ইউনিট দুটি পরিদর্শন করে। তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বড় ধরনের সংস্কার ছাড়া ইউনিট দুটি চালু রাখা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তবে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা বেশি থাকায় আপাতত অস্থায়ী মেরামতের মাধ্যমে ইউনিট দুটি চালু রাখা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, ইউনিট দুটি সংস্কারের উদ্যোগ প্রথম নেওয়া হয় ২০১৮ সালে। সে সময় তোশিবা ইউনিটগুলোর কারিগরি মূল্যায়ন করে। পরে ২০১৯ সালে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করা হলেও প্রতিযোগিতা না থাকায় তা বাতিল হয়। এরপর ২০১৯ সালের ডিসেম্বর, ২০২১ সালের মে এবং ২০২২ সালের জানুয়ারিতে তিন দফা আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করা হয়।
তবে ইউনিটগুলো তোশিবার প্রযুক্তিতে নির্মিত হওয়ায় বাংলাদেশে তাদের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো কোম্পানি শর্ত পূরণ করতে পারেনি। পাশাপাশি স্থানীয় ঠিকাদারদের আপত্তির কারণে দরপত্র প্রক্রিয়াগুলোও বাতিল হয়ে যায়। এতে প্রকল্পটি বছরের পর বছর স্থবির হয়ে পড়ে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকৌশলীরা বলছেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অর্থায়নের অংশ হিসেবেই জাইকা এই প্রকল্পে আগ্রহ দেখিয়েছে। কারণ কাপ্তাইয়ের কর্ণফুলী কেন্দ্রই দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র। তাদের মতে, এই কেন্দ্রের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় অত্যন্ত কম। জ্বালানি খরচ না থাকায় কখনও কখনও প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় এক টাকার নিচেও নেমে আসে।
নতুন প্রকল্প প্রস্তাবে শুধু জেনারেটর নয়, ইউনিট দুটির টারবাইন অংশও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ২০১৮ সালে প্রকল্প ব্যয় ১০০ কোটির বেশি ধরা হলেও বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে সেই ব্যয় আরও বাড়তে পারে।
বিপিডিবির প্রকল্প পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ডেইজি পারভীন জানিয়েছেন, জাইকা ইতোমধ্যে ইউনিট দুটি সংস্কারে অর্থায়নের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে একটি দল কেন্দ্র পরিদর্শন করেছে এবং কী ধরনের কাজ প্রয়োজন তা নির্ধারণ করে বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কাজ চলছে।
রাঙামাটির কাপ্তাইয়ে অবস্থিত কর্ণফুলী জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ১৯৬২ সালে উৎপাদনে আসে। বর্তমানে পাঁচটি ইউনিটের মাধ্যমে কেন্দ্রটির মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২৩০ মেগাওয়াট।

