আসন্ন বাজেটে স্বল্প আয়ের মানুষের ওপর বাড়তি করের চাপ না চাপিয়ে একটি ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব এবং পূর্বানুমানযোগ্য কর ব্যবস্থা গঠনের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে যেসব কর ছাড়ের সুবিধা সরাসরি সাধারণ ভোক্তার কাছে পৌঁছায় না, সেগুলো নিরুৎসাহিত করার কথাও বলেন তিনি।
গতকাল বৃহস্পতিবার (১৪ মে) আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস শুল্ক বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে এক দীর্ঘ বৈঠকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
কর্মকর্তারা জানান, ২০২৬–২৭ অর্থবছরের বাজেটে কিছু ক্ষেত্রে সীমিত কর ছাড় থাকলেও বেশ কয়েকটি খাতে করের চাপ বাড়তে পারে। বিশেষ করে উচ্চ আয়ের ব্যক্তিদের ওপর বাড়তি কর আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক প্রস্তাবে নীতিগত সম্মতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো সম্পদ কর চালুর উদ্যোগ। এই করের মাধ্যমে উচ্চ সম্পদশালীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যাংক আমানতের ওপর আবগারি শুল্ক অব্যাহতির প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে। পাশাপাশি কেরু অ্যান্ড কোম্পানির উৎপাদিত মদের ওপর মূল্য সংযোজন কর আরোপের বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
নতুন পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্যাংক হিসাব খুলতে এখন ব্যবসা শনাক্তকরণ নম্বর (বিআইএন) প্রয়োজন হবে। এই নম্বর ইস্যুর প্রক্রিয়া সহজ করা হবে এবং পূর্বানুমতি ছাড়াই তা দ্রুত পাওয়া যাবে। নতুন বাজেটে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ওপর নতুন কর আরোপের সম্ভাবনাও রয়েছে। একই সঙ্গে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ব্যক্তিগত করদাতাদের বর্তমান কর কাঠামো স্থিতিশীল রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
সাবেক চেয়ারম্যান অর্থনীতিবিদ মোহাম্মদ আবদুল মজিদ বলেন, রাজস্ব বাড়ানো জরুরি হলেও তা যেন নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে। তার মতে, কর ফাঁকি রোধ ও প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানোই টেকসই রাজস্ব বৃদ্ধির মূল পথ।
বৈঠকে অর্থমন্ত্রী, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সকাল থেকে শুরু হওয়া এ বৈঠক সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে। সরকার আগামী অর্থবছরে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য নিয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য খাত থেকেও অতিরিক্ত রাজস্ব সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে।
সম্পদ কর ও আবগারি শুল্ক নিয়ে আলোচনায় বলা হয়, সম্পদের নিট মূল্যের ওপর সরাসরি কর আরোপের সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে নির্দিষ্ট সীমার বেশি সম্পদের ওপর সর্বোচ্চ ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত সারচার্জ কার্যকর আছে। ব্যাংক আমানতের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ৩ লাখ টাকার সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাবেও সম্মতি দেওয়া হয়েছে। এতে ছোট সঞ্চয়কারীরা কিছুটা স্বস্তি পাবেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ব্যক্তিগত করমুক্ত আয়ের সীমা পর্যায়ক্রমে বাড়ানোর পরিকল্পনাও আলোচনায় আসে। ২০২৮–২৯ অর্থবছর থেকে এই সীমা ৪ লাখ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে এবং পরবর্তী কয়েক বছর তা অপরিবর্তিত রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় চাল ও ডালের মতো পণ্যের ওপর কর বাড়ানোর প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী সম্মতি দেননি। ফলে এসব পণ্যের ওপর কর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আপাতত স্থগিত রয়েছে।
সভায় বলা হয়, যেসব খাত অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে সরাসরি অবদান রাখে, সেগুলোর জন্য কর ছাড় দেওয়া হতে পারে। তবে এই ছাড় এমনভাবে নির্ধারণ করতে হবে, যাতে পুরো খাতের সব প্রতিষ্ঠান সমানভাবে সুবিধা পায়। নীতিনির্ধারণে আরও বলা হয়, অদক্ষ শ্রমনির্ভর শিল্পের পরিবর্তে দক্ষ ও প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পে কর সুবিধা বেশি দেওয়া উচিত।
কর ছাড় নিয়ে আরও বলা হয়, যেসব সুবিধা সাধারণ মানুষের কাছে না পৌঁছে নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে সীমিত থাকে, সেগুলো নিরুৎসাহিত করা হবে। কর্মকর্তারা জানান, কর অব্যাহতি পুরোপুরি বাতিল না করে তা যৌক্তিক করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে বাস্তব প্রভাব পড়ে। সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক একটি আর্থিক সংস্থার পক্ষ থেকে কর–জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর জন্য চাপ রয়েছে। তবে সরকার এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্তভাবে একমত হয়নি।
