হাওরের বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এবার দেখা গেছে অস্বাভাবিক এক দৃশ্য। একই ক্ষেতে কোনো ধান পেকে গেছে, কোনোটি এখনও কাঁচা। কোথাও আবার শীষই বের হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে সময়মতো ধান কাটতে পারেননি কৃষকরা। এর মধ্যেই অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ডুবে গেছে ফসলি জমি। ফলে একদিকে পাকা ধান ঝরে পড়েছে, অন্যদিকে কাঁচা ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সব মিলিয়ে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন কৃষকরা।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ ও ইটনা, সুনামগঞ্জের ধর্মপাশা ও মধ্যনগর ঘুরে কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা এবং বীজ পরিবেশকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সমস্যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের সরবরাহ করা ব্রি-৮৮ জাতের ধানের বীজ। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন জেলায় বিতরণ করা ব্রি-৮৮ বীজের সঙ্গে ব্রি-৯২ জাতের ধানের বীজ মিশে গেছে। এই মিশ্রণের ঘটনা ঘটেছে চুয়াডাঙ্গার বিএডিসির বীজ প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে।
বিএডিসির গবেষণা সেলের যুগ্ম পরিচালক ড. মো. নাজমুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর মাঠপর্যায়ে তদন্ত চালিয়ে তারা বীজ মিশ্রণের উৎস শনাক্ত করেছেন। তদন্তে নিশ্চিত হওয়া গেছে, চুয়াডাঙ্গা কেন্দ্রেই দুটি জাতের বীজ একসঙ্গে মিশে যায়। এ ঘটনায় জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলি করা হয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তারা জানান, ব্রি-৮৮ ধান সাধারণত ১৪০ থেকে ১৪৫ দিনের মধ্যে পেকে যায়। অন্যদিকে ব্রি-৯২ পাকতে সময় লাগে ১৫০ থেকে ১৫৬ দিন। হাওর অঞ্চলে আগাম বন্যার ঝুঁকি থাকায় কৃষকদের দ্রুত ফসল ঘরে তোলার সুবিধার জন্য ব্রি-৮৮ চাষে উৎসাহ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একই জমিতে দুই জাতের ধান থাকায় কিছু ধান আগে পেকে যায়, আর কিছু ধান কাঁচা থেকে যায়। ফলে কৃষকরা সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি কখন ধান কাটবেন। বিএডিসির তথ্য অনুযায়ী, অন্তত এক লাখ কেজি বীজে এই মিশ্রণের ঘটনা ঘটেছে। যদিও অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের কারণে অন্য অনেক ক্ষেতের ধানও ক্ষতির মুখে পড়েছে।
হাওরের কৃষকরা জানেন, পাহাড়ি ঢল যে কোনো সময় নেমে আসতে পারে। তাই সাধারণত দ্রুত ধান কেটে ঘরে তোলাই তাদের লক্ষ্য থাকে। কিন্তু এবার একই জমিতে বিভিন্ন সময়ে ধান পাকায় কৃষকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে। সুনামগঞ্জের ধর্মপাশার মেউহারি গ্রামের কৃষক ননীগোপাল চন্দ্র সরকার বলেন, আরও দুই-তিন দিন অপেক্ষা করলে সব ধান একসঙ্গে কাটা যাবে বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু তার আগেই রাতে হঠাৎ পানি ঢুকে পুরো জমি তলিয়ে যায়।
উপজেলা কৃষি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ধর্মপাশা ও মধ্যনগরে এবার প্রায় ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে ব্রি-৮৮ আবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে অন্তত পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে ব্রি-৯২ এর মিশ্রণ পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার কৃষক হাবিবুর রহমান ১৩ কানি জমিতে ব্রি-৮৮ আবাদ করেছিলেন। এখন তাঁর অধিকাংশ জমিই পানির নিচে। তিনি জানান, শুরুতে ধানের চারায় কোনো পার্থক্য বোঝা যায়নি। পরে দেখা যায়, একেক অংশের ধান একেক অবস্থায় রয়েছে। কোনোটি পেকে গেছে, কোনোটি আধাপাকা, আবার কোনোটি কাঁচা। তার হিসাব অনুযায়ী, অন্তত ৪০০ মণ ধান পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু এখন ১০০ মণও পাবেন কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন।
ব্রি-৮৮ হলো বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল ও স্বল্পমেয়াদি বোরো ধানের জাত। এটি মূলত ব্রি-২৮ এর আধুনিক বিকল্প হিসেবে পরিচিত। কৃষি বিভাগ ও বিএডিসি এই জাতকে হাওর অঞ্চলের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী বলে প্রচার করেছিল। কৃষকদের বলা হয়েছিল, এই ধান দ্রুত পাকে এবং আগাম বন্যার আগেই ঘরে তোলা সম্ভব হবে। সেই আশায় অনেক কৃষক বেশি দাম দিয়ে সরকারি প্যাকেটজাত ভিত্তি বীজ কিনেছিলেন। সরকারি বীজ হওয়ায় তারা নিশ্চিন্তও ছিলেন। কৃষকদের ভাষ্য, বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণের সময় কোনো অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েনি। কিন্তু শীষ বের হওয়ার পর থেকেই ভিন্নতা স্পষ্ট হতে শুরু করে।
সুনামগঞ্জের কৃষক মঞ্জুরুল হক বলেন, একই জমিতে তিন ধরনের ধান দেখা গেছে। কোনো গাছের শীষ বড়, কোনোটি ছোট। আবার কোনো ধান আগে পেকে গেছে, অন্যগুলো তখনও কাঁচা ছিল। তার আশা ছিল অন্তত ১০০ মণ ধান পাবেন। শেষ পর্যন্ত ৪০ মণও ঘরে তুলতে পারেননি।
ধর্মপাশার বিভিন্ন হাওর এলাকার কৃষকরাও একই অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। কৃষক জানু মিয়া বলেন, পরে জানতে পারেন যে যেসব ধান পাকতে দেরি হচ্ছে, সেগুলো ব্রি-৯২ জাতের। ব্রি-৯২ পাকতে পাকতেই ব্রি-৮৮ ঝরে যেতে শুরু করে। এর মধ্যেই হাওরে পানি ঢুকে পড়ে। তরুণ কৃষক বাপ্পীর অভিযোগ, একই বস্তায় কয়েক ধরনের বীজ ছিল, যা কৃষকদের বড় বিপদের মুখে ফেলেছে।
শুধু হাওর অঞ্চল নয়, দেশের অন্য এলাকাতেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। রাজশাহীর পবা উপজেলার কৃষক মোর্শেদ আলীর জমিতে তিন ধরনের ধান দেখা গেছে। একটি মাটিতে পড়ে গেছে, একটি সদ্য পেকেছে, আরেকটির শীষ তখনও বের হচ্ছিল। তিনি বলেন, গত বছর একই জমিতে ভালো ফলন হয়েছিল। তার দেখাদেখি আশপাশের কৃষকরাও এবার ব্রি-৮৮ চাষ করেছিলেন। কিন্তু এবার সবাই ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় সরকারি প্রণোদনার আওতায় দেওয়া ধান বীজ নিয়েও একই অভিযোগ উঠেছে। কৃষকদের দাবি, একই জমিতে ধানের বিভিন্ন অবস্থা দেখা গেছে এবং অনেক গাছের শীষ শুকিয়ে গেছে।
কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে কৃষি বিভাগের প্রদর্শনী ক্ষেতেও একই বিপর্যয় দেখা গেছে। কৃষক ওমর সিদ্দিক ১৫ বিঘা জমিতে সরকারি প্রকল্পের আওতায় প্রদর্শনী ক্ষেত করেছিলেন। সেই জমিতেও একইভাবে মিশ্রিত ধানের সমস্যা দেখা দেয়। তিনি বলেন, প্রদর্শনী ক্ষেতের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ কৃষকদের অবস্থা আরও ভয়াবহ।
মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তারাও বলছেন, এমন পরিস্থিতি আগে খুব কম দেখা গেছে। কিশোরগঞ্জের অন্তত ১৫ জন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধু এই জেলাতেই প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে একই সমস্যা দেখা গেছে।
কিশোরগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাদিকুর রহমান বলেন, মাঠে গিয়ে দেখা গেছে একই জমিতে কিছু ধান পেকে গেছে, কিছু আধাপাকা, আবার কিছু কাঁচা। এতে স্পষ্ট হয়েছে যে বীজে বিভিন্ন জাতের মিশ্রণ ছিল। আর সেই কারণেই বহু কৃষক এবার ভয়াবহ ক্ষতির মুখে পড়েছেন।

