দেশে আলুর উৎপাদন বাড়লেও সঠিক বাছাই ও সংরক্ষণের অভাবে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ আলু নষ্ট হয়ে যায়। এই ক্ষতি কমাতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়-এর একদল গবেষক। তারা তৈরি করেছেন স্বয়ংক্রিয় আলু বাছাইকরণ যন্ত্র, যা ঘণ্টায় ৫০০ কেজির বেশি আলু বাছাই করতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতি কেজি আলু বাছাইয়ে খরচ পড়বে মাত্র ১২ পয়সা।
গবেষকদের দাবি, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় এই প্রযুক্তি অনেক বেশি দ্রুত, সাশ্রয়ী ও নির্ভুল। এতে আলুর অপচয় কমবে, রফতানিযোগ্য মান নিশ্চিত হবে এবং কৃষকও ন্যায্যমূল্য পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে আলু সংগ্রহের পর সংরক্ষণ ও বিপণন পর্যায়ে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয়। আলু বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এখনো অধিকাংশ জায়গায় হাতে করা প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে সময় বেশি লাগে, শ্রম ব্যয় বাড়ে এবং মান নির্ধারণে একরকম অসঙ্গতি তৈরি হয়।
এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই গবেষকরা স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। যন্ত্রটি মূলত আলুর বাহ্যিক গঠন ও আকার বিশ্লেষণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রেডিং করতে পারে। অর্থাৎ কোন আলু রফতানিযোগ্য, কোনটি প্রক্রিয়াজাত শিল্পের জন্য উপযুক্ত বা কোনটি সাধারণ বাজারজাতের জন্য ভালো—তা দ্রুত নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
গবেষণা দলের প্রধান এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি শক্তি ও যন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক আনিসুর রহমান বলেন, দেশে এখনো আলু বাছাইয়ের কাজ অনেকটাই সনাতন পদ্ধতিতে হয়। এতে শ্রম ও সময় দুটিই বেশি লাগে। একই সঙ্গে মান নিয়ন্ত্রণও কঠিন হয়ে পড়ে। এসব সমস্যা সমাধান করতেই তারা স্বয়ংক্রিয় আলু গ্রেডার তৈরি করেছেন।
তিনি জানান, যন্ত্রটির বর্তমানে তৃতীয় সংস্করণ নিয়ে কাজ চলছে এবং এতে আগের তুলনায় বড় ধরনের উন্নয়ন আনা হয়েছে। প্রথম দিকের সংস্করণে পিক্সেলভিত্তিক বিশ্লেষণের কারণে যন্ত্রটির গতি সীমিত ছিল। তখন ব্যবহৃত ক্যামেরা প্রতি মিনিটে মাত্র ১৪টি ছবি বিশ্লেষণ করতে পারত। কিন্তু এখন আধুনিক শিল্পকারখানায় ব্যবহৃত সিসিডি ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে, যা প্রতি সেকেন্ডে ৫৩৯টি পর্যন্ত ছবি ধারণ করতে সক্ষম। ফলে আলু শনাক্ত ও বাছাইয়ের গতি অনেক বেড়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য, যন্ত্রটি দেশীয় উপকরণ ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পরীক্ষাগার পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে। খুব শিগগিরই মাঠপর্যায়ে এর ব্যবহার শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
গবেষণা দলের আরেক সদস্য রোস্তম আলী বলেন, দেশে আলুর উৎপাদন এখন চাহিদার তুলনায় অনেক বেশি। গত বছর দেশে প্রায় ১ কোটি ১৫ লাখ টন আলু উৎপাদিত হয়েছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা ছিল প্রায় ৯০ লাখ টন। অর্থাৎ অতিরিক্ত বিপুল পরিমাণ আলু রফতানির সুযোগ রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে মানসম্মত গ্রেডিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি মনে করেন, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে আলুর পচন ও অপচয় কমবে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যশিল্প ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোও সহজে মানসম্পন্ন আলু সংগ্রহ করতে পারবে।
কৃষি খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এখনো সীমিত। ফলে ফসল সংগ্রহের পর বড় ধরনের ক্ষতি হয়। বিশেষ করে আলুর মতো পচনশীল কৃষিপণ্যে আধুনিক গ্রেডিং ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির অভাব দীর্ঘদিনের সমস্যা। এ ধরনের প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেওয়া গেলে কৃষকের আয় বাড়বে এবং রফতানি সম্ভাবনাও সম্প্রসারিত হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি খাতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন বাড়াতে পারলে শুধু উৎপাদন নয়, কৃষিপণ্যের মান ও বাজারব্যবস্থাতেও বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। বাকৃবির এই উদ্ভাবন সেই সম্ভাবনারই নতুন উদাহরণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

