বিশ্বের প্রভাবশালী দাতব্য ও সামাজিক উন্নয়ন নেতাদের তালিকা ‘টাইম ওয়ান হান্ড্রেড ফিলানথ্রপি ২০২৬’-এ জায়গা করে নিয়েছেন আসিফ সালেহ। এ স্বীকৃতির মাধ্যমে তিনিই প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আন্তর্জাতিক এই মর্যাদাপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলেন।
বিশ্বখ্যাত সাময়িকী টাইম প্রতি বছর সমাজ পরিবর্তন, মানবিক সহায়তা ও উন্নয়ন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা ১০০ জন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়ে এ তালিকা প্রকাশ করে। ২০২৬ সালের সংস্করণে বিশ্বজুড়ে উন্নয়ন ও দাতব্য খাতে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করা নেতা, উদ্ভাবক ও সমাজকর্মীদের স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
আসিফ সালেহকে ‘লিডার্স’ ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ তালিকায় তাঁর সঙ্গে রয়েছেন রাজীব জে শাহ, ইদ্রিস এলবা, সাবরিনা ধাওরে এলবা এবং লিওনেল মেসি-র মতো বিশ্বপরিচিত ব্যক্তিত্বরা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীভিত্তিক উন্নয়ন মডেলকে বৈশ্বিক পর্যায়ে তুলে ধরা এবং আন্তর্জাতিক সহায়তা ব্যবস্থায় আরও ন্যায়সংগত ও টেকসই দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিষ্ঠার জন্য আসিফ সালেহকে এ স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
টাইমের প্রতিবেদনে বিশেষভাবে উঠে এসেছে ব্র্যাক-এর বিকল্প অর্থায়ন কৌশল ও কমিউনিটিভিত্তিক উন্নয়ন দর্শন। বৈশ্বিক সহায়তা তহবিল কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ব্র্যাক কীভাবে অনুদান, ক্ষুদ্রঋণ, সামাজিক ব্যবসা, বিনিয়োগ ও স্থানীয় অংশগ্রহণের সমন্বয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, সেটিকে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
টাইম তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, বৈদেশিক সহায়তা কমে যাওয়ার পর বিশ্বে উন্নয়নের নতুন মডেল নিয়ে আলোচনা বাড়ছে এবং ব্র্যাক সেই বিকল্প মডেলের একটি কার্যকর উদাহরণ হতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য এ স্বীকৃতিকে তাৎপর্যপূর্ণ বলছেন বিশ্লেষকরা। কারণ, দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে উন্নয়ন সহায়তা গ্রহণকারী দেশ হিসেবে দেখা হলেও এখন দেশটির প্রতিষ্ঠান ও নেতৃত্ব বৈশ্বিক উন্নয়ন ভাবনায় প্রভাব ফেলছে।
১৯৭২ সালে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্য নিয়ে স্যার ফজলে হাসান আবেদ ব্র্যাক প্রতিষ্ঠা করেন। ছোট পরিসরের ত্রাণ কার্যক্রম থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি এখন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সংস্থায় পরিণত হয়েছে। এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও ব্র্যাকের উন্নয়ন মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে।
আসিফ সালেহ প্রতিক্রিয়ায় বলেন, এই স্বীকৃতি শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং গত পাঁচ দশকে এশিয়া ও আফ্রিকার যেসব মানুষ ব্র্যাকের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং যেসব কর্মী প্রতিদিন মাঠপর্যায়ে মানুষের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করছেন, এটি তাদের সবার অর্জন।
উন্নয়ন নিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গিও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষায়, উন্নয়ন কোনো দান নয়। দান এমন কিছু, যেখানে মানুষ কেবল গ্রহণকারী হয়ে থাকে। কিন্তু ব্র্যাক মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণকে গুরুত্ব দেয় এবং মানুষকে নিজেদের পরিবর্তনের চালিকাশক্তি হিসেবে দেখে।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন আসিফ সালেহ। তিনি বলেন, বিশ্ব এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দারিদ্র্য বাড়ছে, সংঘাত সরবরাহব্যবস্থাকে ভেঙে দিচ্ছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি লাখো মানুষকে আবার দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
তাঁর মতে, এই পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে যে বৈশ্বিক সমতা প্রতিষ্ঠায় বিশ্ব যথেষ্ট উচ্চাকাঙ্ক্ষী ছিল না। তাই আগের ধাঁচের উন্নয়ন কৌশল দিয়ে বর্তমান সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। বরং এমন এক উন্নয়ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন, যেখানে মানুষকে শুধু সহায়তা গ্রহণকারী নয়, বরং নিজেদের পরিবর্তনের অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আসিফ সালেহর এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতারও প্রতীক। এটি প্রমাণ করছে, বাংলাদেশ এখন শুধু উন্নয়ন সহায়তার গ্রহীতা নয়; বরং উন্নয়ন ভাবনা ও সামাজিক উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও বিশ্বকে নেতৃত্ব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে।

