প্রতি বছর ১৬ মে ঘুরে এলে একটি নাম আবার সামনে চলে আসে—ফারাক্কা। এটি শুধু একটি বাঁধের পরিচয় নয়, বরং বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থা, কৃষি, অর্থনীতি এবং ভূরাজনীতির দীর্ঘদিনের সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই দিনকে ঘিরে আলোচনা ও স্মৃতিচারণা হয়। এরপর আবার বিষয়টি ধীরে ধীরে আড়ালে চলে যায়। অথচ দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোর অবক্ষয়, সুন্দরবনের ক্রমবর্ধমান লবণাক্ততা এবং কৃষিতে যে ক্ষতি হচ্ছে—সবকিছুর সঙ্গেই ফারাক্কার কোনো না কোনো সম্পর্ক রয়েছে।
এবার পরিস্থিতি আরও বেশি সংবেদনশীল। ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ এই বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হতে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে এটি একটি ঐতিহাসিক সুযোগ, অন্যদিকে প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ফারাক্কার বিরুদ্ধে ভাসানীর ঐতিহাসিক পদযাত্রা:
ফারাক্কার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের একটি বড় অধ্যায় শুরু হয়েছিল ১৯৭৬ সালের ১৬ মে। সেদিন ৯৬ বছর বয়সে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী হাসপাতালের শয্যা ছেড়ে রাজশাহী থেকে ফারাক্কার উদ্দেশে লাখো মানুষকে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। তাঁর দাবি ছিল একটাই—বাংলাদেশকে তার ন্যায্য পানির অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে।
তিনি সেদিন বলেছিলেন, ফারাক্কা বাঁধ না ভাঙলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে মরুভূমিতে পরিণত হবে। তিনি আরও ইঙ্গিত করেছিলেন, সময় লাগলেও এই দাবির লড়াই একদিন না একদিন অব্যাহত থাকবে—মানুষ আসবে, পরবর্তী প্রজন্মও এই আন্দোলন চালিয়ে যাবে। প্রায় অর্ধশতাব্দী পর দাঁড়িয়ে দেখা যায়, সেই সতর্কবার্তার অনেক অংশই বাস্তবতার সঙ্গে মিলে গেছে।

এই আন্দোলন শুধু রাজনৈতিক প্রতিবাদ ছিল না। এটি ছিল পানির ন্যায্য অধিকার আদায়ের একটি বৃহৎ গণজাগরণ। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও সেই লড়াই এখনো সম্পূর্ণ সমাধানে পৌঁছায়নি। ১৯৬১ সালে ফারাক্কা বাঁধের নির্মাণ শুরু হয় এবং ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল এটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। ওই সময় ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি স্বল্পমেয়াদি সমঝোতা হয়েছিল, যা ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে ১৯৭৫ পর্যন্ত কার্যকর ছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৭৬ সালে পানি সংকট প্রকট আকার ধারণ করে।
ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, কলকাতা বন্দরের নাব্যতা রক্ষা এবং হুগলি নদীকে পুনরুজ্জীবিত করাই ছিল এই প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। বাস্তবে ফারাক্কা প্রকল্পের মাধ্যমে গঙ্গা নদী থেকে প্রায় ৪০ হাজার কিউসেক পানি ফিডার খালের মাধ্যমে ভাগীরথী-হুগলি নদীতে সরিয়ে নেওয়া হয়, যার বড় অংশ বাংলাদেশের প্রাপ্য পানির ওপর প্রভাব ফেলে।
তবে লক্ষ্য পূরণ পুরোপুরি হয়নি। কলকাতা বন্দর পলির সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারেনি। বরং গঙ্গার উজানে পলি জমে বিহার ও উত্তর প্রদেশে প্রতিবছর ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে মালদহ ও মুর্শিদাবাদে নদীভাঙনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে ফারাক্কা প্রকল্প শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, ভারতের জন্যও এক ধরনের দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পরিণত হয়েছে।
বাঁধ চালুর আগে শুষ্ক মৌসুমে হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে গঙ্গার গড় প্রবাহ ছিল প্রায় ৬৫ হাজার কিউসেক। বাঁধ চালুর পর কোনো কোনো বছর তা কমে দাঁড়ায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ হাজার কিউসেক পর্যন্ত। ২০১৫ সালের শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় প্রবাহ ছিল প্রায় ২৫ হাজার কিউসেক। চুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের পাওয়ার কথা ছিল ১২ হাজার ৫০০ কিউসেক, কিন্তু বাস্তবে প্রাপ্তি ছিল তার চেয়েও কম। ১৯৯৬ সালের গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির পরও গবেষণায় দেখা গেছে, শুষ্ক মৌসুমে প্রবাহ সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে পদ্মা নদীর বিস্তীর্ণ এলাকায়, যা এখন অনেক জায়গায় বালুচরে পরিণত হয়েছে।
বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ আর্থিক ক্ষতি শত বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা ছয় কোটিরও বেশি। পদ্মা নদীর পলিপ্রবাহও ১৯৬০ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কমে গেছে। সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে কৃষিতে। গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের আওতায় থাকা প্রায় এক লাখ ২১ হাজার হেক্টর জমির সেচ ব্যবস্থা এই পানির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে বহু পাম্প এখন বন্ধ বা আংশিকভাবে কার্যকর।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট। কুষ্টিয়া ও চুয়াডাঙ্গার কৃষকেরা শুষ্ক মৌসুমে এক ফসলি জমির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আগে যেখানে ৮ থেকে ১০ ফুটে পাওয়া যেত, এখন তা ১৫ ফুটেও মিলছে না। অনেক এলাকায় এই স্তর ৬০ থেকে ১০০ ফুটের নিচে নেমে গেছে। মৌসুমি বৃষ্টিও সেই ঘাটতি পূরণ করতে পারছে না।
দেশের শতাধিক নদী ও খাল-বিল শুকিয়ে প্রায় মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। কপোতাক্ষ, ভৈরব, নবগঙ্গা, চিত্রার মতো নদীগুলোর অস্তিত্ব এখন অনেকটাই স্মৃতিনির্ভর। একসময়ের প্রমত্ত পদ্মা এখন বহু জায়গায় চর জেগে ওঠা নদীতে পরিণত হয়েছে, যেখানে নৌচলাচলের বদলে মানুষ হাঁটাচলা করছে।
লবণাক্ততার আগ্রাসনও বাড়ছে। মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় বঙ্গোপসাগরের লোনাপানি দেশের অভ্যন্তরে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কিলোমিটার পর্যন্ত প্রবেশ করছে। এর ফলে সুন্দরবনের সুন্দরীগাছ আগামরা রোগে আক্রান্ত হয়ে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ছে। বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল, মাছের প্রজননসহ পুরো প্রতিবেশ ব্যবস্থা এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের সঙ্গে এই পরিস্থিতি মিলিয়ে একটি দ্বিমুখী চাপ তৈরি হয়েছে।
এ সংকটের আরও একটি চিত্র হলো ঋতুভিত্তিক বৈপরীত্য। শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে যায়, আবার বর্ষায় অনেক সময় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে গেট খুলে দেওয়া হয়। ফলে দুই মৌসুমে দুই ধরনের আঘাত নেমে আসে, যার উৎস একটিই। এই বাস্তবতা দেখায়, ফারাক্কা এখন শুধু একটি বাঁধ নয়; এটি নদীনির্ভর অর্থনীতি, কৃষি ও পরিবেশ ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি চাপের প্রতীক।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয় ১৯৭২ সালে। এরপর ১৯৭৭ সালে প্রথম পাঁচ বছর মেয়াদি পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তবে ১৯৮৮ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর কোনো কার্যকর চুক্তি ছিল না। এই সময়ে ফারাক্কা বাঁধের পানি ব্যবস্থাপনা একতরফাভাবে পরিচালিত হয় বলে অভিযোগ ওঠে, যার প্রভাব বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে পড়ে।
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর স্বাক্ষরিত ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। এই চুক্তিতে পানিপ্রবাহের পরিমাণ অনুযায়ী হিস্যা নির্ধারণ করা হয়। ফারাক্কায় পানিপ্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম হলে দুই দেশ সমান পানি পাবে। প্রবাহ ৭০ থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানি নিশ্চিতভাবে পাবে, বাকিটা পাবে ভারত। আর প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পাবে, বাকিটা বাংলাদেশের পাওয়ার কথা। এছাড়া ১ এপ্রিল থেকে ১০ মে পর্যন্ত তিনটি ১০ দিনের নির্দিষ্ট সময়ে উভয় দেশ পর্যায়ক্রমে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার বিধানও ছিল। তবে বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, এই চুক্তি থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ বহু সময় তার নির্ধারিত হিস্যা পায়নি। ভারতের অভ্যন্তরীণ ব্যবহার এবং উজানের বিভিন্ন স্থাপনার কারণে বাংলাদেশের প্রাপ্য পানির পরিমাণ বারবার কমে গেছে।
এই চুক্তির মেয়াদ ২০২৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হতে যাচ্ছে। এখন পর্যন্ত নতুন চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে দৃশ্যমান কোনো আলোচনা শুরু হয়নি। এই নিষ্ক্রিয়তা অব্যাহত থাকলে ২০২৭ সাল থেকে আবারও একতরফা পানি ব্যবস্থাপনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন আবেগনির্ভর অবস্থান থেকে সরে এসে তথ্যভিত্তিক ও কৌশলগত কূটনীতির পথে এগোতে হবে। করণীয়কে একক নয়, বরং একাধিক সমান্তরাল প্রক্রিয়ায় ভাগ করে নিতে হবে।
প্রথমত, ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের সময়সীমাকে গুরুত্ব দিতে হবে। নতুন চুক্তিতে শুধু পানির হিস্যা নয়, চুক্তি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জবাবদিহির ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি। পানিবণ্টনের ভিত্তি আন্তর্জাতিক নদী আইনের ন্যায্য ও যুক্তিসংগত ব্যবহার নীতির ওপর নির্ধারণ করা দরকার। যৌথ নদী কমিশনকে আরও শক্তিশালী করে তৃতীয় পক্ষের পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার বিষয়টিও বিবেচনায় আনা যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ এখনো জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপথ কনভেনশন ১৯৯৭ অনুমোদন করেনি। যদিও নীতিগত আলোচনা হয়েছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক অগ্রগতি সীমিত। এই কনভেনশন আন্তসীমান্ত নদীতে ভাটির দেশের ন্যায্য হিস্যার আইনি ভিত্তি তৈরি করে। এটি অনুমোদন করলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে এবং কূটনৈতিক চাপ তৈরির একটি কার্যকর হাতিয়ার তৈরি হতে পারে।
তৃতীয়ত, ফারাক্কা এককভাবে নয়, বরং তিস্তা, মনু, মহানন্দাসহ ৫৪টি অভিন্ন নদীকে একটি সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার প্রয়োজন রয়েছে। আলাদা আলাদা আলোচনায় কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ার ঝুঁকি থাকে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা অববাহিকাকে কেন্দ্র করে নেপাল, ভুটান ও চীনের মতো উজানের দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলার কথাও বলা হচ্ছে। আন্তর্জাতিকভাবে দানিউব কমিশন, নাইল বেসিন উদ্যোগ ও মেকং রিভার কমিশন এ ধরনের ব্যবস্থাপনার উদাহরণ।
চতুর্থত, পুরো অববাহিকায় রিয়েল-টাইম তথ্য ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। কোথায় কত পানি প্রবাহিত হচ্ছে, কোথায় ঘাটতি, কোথায় লবণাক্ততা বাড়ছে—এই তথ্য নিয়মিতভাবে প্রকাশ করা দরকার। কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করতে শুধু বক্তব্য নয়, তথ্যভিত্তিক উপস্থাপন জরুরি। বাংলাদেশ জাতিসংঘের ১৯৯২ সালের পানি কনভেনশন অনুমোদন করেছে, ফলে ন্যায্য ক্ষতিপূরণের দাবি তোলার আইনি ভিত্তিও রয়েছে।
পঞ্চমত, ভারতের অভ্যন্তরেও ফারাক্কা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। বিহার ও উত্তর প্রদেশে বন্যা এবং মালদহ-মুর্শিদাবাদে নদীভাঙনের জন্য এই প্রকল্পকে দায়ী করা হয়। সেই অভ্যন্তরীণ অবস্থানের সঙ্গে সংযোগ তৈরি করা বাংলাদেশের জন্য একটি কৌশলগত সুযোগ হতে পারে। পানি ইস্যুকে আবেগের পরিবর্তে অর্থনৈতিক ও উন্নয়নগত বাস্তবতার ভিত্তিতে আলোচনায় আনা জরুরি। পাশাপাশি ভারতও এখন আঞ্চলিক সংযোগ ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওপর অনেক ক্ষেত্রে নির্ভরশীল—এই বাস্তবতাও আলোচনায় গুরুত্ব পেতে পারে।
ষষ্ঠত, অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতির দিকেও নজর দিতে হবে। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি ধরে রেখে শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহারের জন্য পদ্মা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা ইতিমধ্যে একনেকে অনুমোদিত হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে নদী ড্রেজিং, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, ভূগর্ভস্থ পানির নিয়ন্ত্রিত ব্যবহার এবং লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত সম্প্রসারণ জরুরি। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য আলাদা পানি ও জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা অঞ্চল গড়ে তোলার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

সব মিলিয়ে ফারাক্কা চুক্তির ভবিষ্যৎ শুধু দুই দেশের সম্পর্কের বিষয় নয়, বরং বাংলাদেশের পানি নিরাপত্তা, কৃষি ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত একটি বাস্তবতা। হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে বদলে যাচ্ছে বৃষ্টিপাতের ধরন। জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী দুই দশকে দক্ষিণ এশিয়ায় পানি হয়ে উঠতে পারে সবচেয়ে বড় ভূরাজনৈতিক ইস্যু। এই বাস্তবতায় শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতও পানির চাপের মুখে রয়েছে। ফলে সংঘাত নয়, বরং যৌথ ব্যবস্থাপনাই এখন টেকসই সমাধানের একমাত্র পথ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে ফল পেতে পাঁচ থেকে দশ বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। তবে অভ্যন্তরীণ অভিযোজনমূলক পদক্ষেপ এখনই শুরু করা সম্ভব। বিশেষ করে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক জলপথ কনভেনশন অনুমোদনের মতো উদ্যোগ দ্রুত নেওয়া গেলে তা ভবিষ্যৎ আলোচনায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে পারে।
ফারাক্কা দিবস তাই শুধু অতীতের ক্ষোভ বা স্মৃতিচারণার দিন হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া দরকার ভবিষ্যতের পানি নিরাপত্তা কৌশল নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। কারণ নদী হারালে শুধু পানি সংকট তৈরি হয় না—এর সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কৃষি, অর্থনীতি, জনপদ এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাও।
মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী একসময় এককভাবে লংমার্চের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন কিন্তু আজকের বাস্তবতায় প্রয়োজন রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মিলিত অগ্রযাত্রা। যেখানে কূটনীতি, আইন ও বিজ্ঞান একসঙ্গে কাজ করবে। ফারাক্কা দিবসকে স্মৃতির গণ্ডি থেকে বের করে ভবিষ্যৎমুখী নীতিনির্ধারণের দিনে রূপান্তর করা জরুরি। নদী বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে—এই বাস্তবতা এখন আরও বেশি প্রাসঙ্গিক।
ফারাক্কা এখন আর শুধু একটি বাঁধের নাম নয়, এটি হয়ে উঠেছে সময়ের এক কঠিন প্রশ্ন। আগামী দিনে পানি থাকবে কি না—এই প্রশ্নের ভেতরেই জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের কৃষি, অর্থনীতি আর অস্তিত্বের অনেকটা অংশ। ইতিহাস বলছে, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় পেরিয়ে যায়, কিন্তু তার ফল ভোগ করতে হয় প্রজন্মের পর প্রজন্ম। ফারাক্কার ক্ষেত্রেও সেই বাস্তবতা এখন চোখের সামনে।
প্রশ্নটা তাই আর অতীত নিয়ে নয়—প্রশ্নটা ভবিষ্যৎ নিয়ে। আমরা কি এখনই প্রস্তুতি নেব, নাকি আবারও অপেক্ষা করব আরেকটি সংকট ঘনিয়ে আসার?

