দীর্ঘ দুই দশকের স্থবিরতার পর অবশেষে বঙ্গোপসাগরের গভীর সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে বড় উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে সরকার। আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের সব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলছেন, এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের জ্বালানি খাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলবে এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর পথ তৈরি হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি ইতোমধ্যে ‘বাংলাদেশ অফশোর মডেল উৎপাদন বণ্টন চুক্তি-২০২৬’ অনুমোদন করেছে। এর পরপরই গভীর ও অগভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে আন্তর্জাতিক কোম্পানির মাধ্যমে অনুসন্ধান কার্যক্রম শুরুর প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, বঙ্গোপসাগরে বিপুল তেল-গ্যাস ও খনিজসম্পদের সম্ভাবনা থাকলেও নীতিগত দুর্বলতা, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারেনি। অথচ প্রতিবেশী ভারত ও মিয়ানমার সমুদ্রসীমায় অনুসন্ধান চালিয়ে উল্লেখযোগ্য গ্যাস মজুতের সন্ধান পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্র শুধু জ্বালানি নয়, মৎস্যসম্পদ, খনিজ ও সামুদ্রিক শিল্পের জন্যও বড় অর্থনৈতিক ক্ষেত্র হতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার পর এত বছরেও বাংলাদেশ গভীর সমুদ্রের সম্ভাবনার বড় অংশ অনাবিষ্কৃত রেখেছে। এমনকি সুনীল অর্থনৈতিক অঞ্চলের এক-তৃতীয়াংশও কার্যকরভাবে অন্বেষণ করা সম্ভব হয়নি।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, অতীতে একাধিকবার অফশোর অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নানা কারণে তা থেমে যায়। ২০০৮ সালে গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধানের দায়িত্ব পাওয়া মার্কিন কোম্পানি কনোকোফিলিপস গ্যাসের মূল্য নির্ধারণ নিয়ে সরকারের সঙ্গে মতবিরোধে কাজ গুটিয়ে নেয়। পরে ভারতের ওএনজিসি, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক যৌথ প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার একটি কোম্পানিও কার্যক্রম চালিয়ে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি দেখাতে পারেনি।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, সমুদ্রাঞ্চলকে মোট ২৬টি ব্লকে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি গভীর সমুদ্রে এবং ১১টি অগভীর সমুদ্রে। নতুন দরপত্রের মাধ্যমে এসব ব্লকে আন্তর্জাতিক জ্বালানি কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হবে।
সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের গ্যাস মজুত দ্রুত কমে আসছে। বর্তমানে দেশে উত্তোলনযোগ্য গ্যাসের অবশিষ্ট মজুত প্রায় ৭ দশমিক ৬৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট। বর্তমান হারে ব্যবহার চললে এই গ্যাস দিয়ে সর্বোচ্চ আরও এক যুগ চাহিদা মেটানো সম্ভব হবে। নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার না হলে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা বড় ঝুঁকিতে পড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জ্বালানি খাত বিশ্লেষকদের অভিযোগ, গত এক দশকে দেশীয় অনুসন্ধানের চেয়ে ব্যয়বহুল এলএনজি আমদানির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা খরচ হলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ ছিল সীমিত। তাদের মতে, রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক স্বার্থের কারণে অনুসন্ধান কার্যক্রম দীর্ঘদিন অবহেলিত ছিল।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, সরকারের মূল লক্ষ্য হচ্ছে জ্বালানিতে স্বনির্ভরতা অর্জন। এ জন্য সমুদ্র ও স্থলভাগ—দুই ক্ষেত্রেই অনুসন্ধান জোরদার করা হচ্ছে। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে দ্রুত বিদেশি বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তি আনার চেষ্টা চলছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান এরফানুল হক জানিয়েছেন, স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ এগোচ্ছে। আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে প্রাথমিক কার্যক্রম সম্পন্ন করার পাশাপাশি তিন বছরের বড় পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন বলেন, দেশে গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো ছাড়া জ্বালানি সংকট থেকে স্থায়ীভাবে বের হওয়ার বিকল্প নেই। তার মতে, এলএনজিনির্ভরতা কমিয়ে দ্রুত গভীর সমুদ্রে অনুসন্ধান বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি ও দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে সামুদ্রিক অর্থনীতি নিয়েও নতুন করে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, গভীর সমুদ্রে টুনাসহ উচ্চমূল্যের মাছ আহরণ, সামুদ্রিক শিল্প, ওষুধ, কসমেটিকস এবং বায়োটেকনোলজির মতো খাতে বাংলাদেশের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ, গবেষণা ও সমন্বিত নীতির অভাবে দেশ এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
পরিসংখ্যান বলছে, সামুদ্রিক মাছ আহরণেও বাংলাদেশ প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক পিছিয়ে। যেখানে ভারত ও মিয়ানমার বছরে কয়েক মিলিয়ন টন মাছ আহরণ করছে, সেখানে বাংলাদেশের সক্ষমতা তুলনামূলকভাবে কম।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রকে কেন্দ্র করে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা নেওয়া গেলে ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। তাই শুধু দরপত্র আহ্বান নয়, কার্যকর বাস্তবায়ন ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

