দেশে এবার আমের উৎপাদন ঘিরে কৃষি খাতে তৈরি হয়েছে স্বস্তির আবহ। প্রাকৃতিক নিয়ম অনুযায়ী এক বছর বেশি ফলন হলে পরের বছর তা কিছুটা কমে যায়। কৃষি পরিভাষায় একে বলা হয় ‘অন ইয়ার’ ও ‘অফ ইয়ার’। চলতি বছর দেশে চলছে ‘অন ইয়ার’। ফলে গাছে মুকুলের পরিমাণ বেশি থাকায় গত বছরের তুলনায় এবার আমের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা। এতে বাজারে সরবরাহ বাড়ার পাশাপাশি কৃষকের আয়েও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তবে উৎপাদন বাড়ার এই ইতিবাচক পরিস্থিতির মধ্যেই রপ্তানি খাতে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে উড়োজাহাজ ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় প্রত্যাশিত পরিমাণে আম বিদেশে পাঠানো নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবেও কিছু গন্তব্য দেশে রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
দেশের অন্যতম শীর্ষ আম ও কৃষিপণ্য রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ট্রেড লিংক গত কয়েক বছরে রপ্তানির ওঠানামার চিত্র তুলে ধরেছে। প্রতিষ্ঠানটি গত বছর ইউরোপের তিন দেশে ৩৫ টন আম রপ্তানি করেছে। এর আগের বছর অর্থাৎ ২০২৪ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৫৫ টন। আর ২০২৩ সালে প্রতিষ্ঠানটির মোট রপ্তানি ছিল ৭৫ টন।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাওসার আহমেদ রুবেল বলেন, “গত বছরও বড় পরিসরে আম রপ্তানির লক্ষ্য ছিল। কিন্তু বিমান ভাড়ার কারণে তা সম্ভব হয়নি। এ বছর পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। আমরা খুব হতাশ।” তিনি জানান, বর্তমানে সুইজারল্যান্ড, জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি শুরু হয়েছে। তবে উড়োজাহাজ ভাড়া অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় খরচ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। বেসরকারি সংস্থাগুলো যুক্তরাজ্যে প্রতি কেজি আমে ৫০৫ টাকা ভাড়া নিচ্ছে। আর সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ বিমান এয়ারলাইন্স নিচ্ছে ৫৮০ টাকা।
রুবেল আরও বলেন, “বাড়তি বিমান ভাড়ার কারণে আম রপ্তানি করে খরচ পোষানো যাচ্ছে না। বেসরকারি ব্যবস্থাতেও গত বছরের তুলনায় প্রতি কেজিতে ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ভাড়া বেড়েছে।”
রপ্তানিকারকদের তথ্য অনুযায়ী, এবার বাগান থেকে রপ্তানিযোগ্য আম সংগ্রহ করতেই প্রতি কেজিতে খরচ হচ্ছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকা। বাছাই, পরিষ্কার, প্যাকিং ও অভ্যন্তরীণ পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ হলে প্রতি কেজিতে মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ১৫০ টাকার বেশি। এরপর আন্তর্জাতিক বাজারে পৌঁছাতে শুধু বিমান ভাড়াই গুনতে হচ্ছে কেজিপ্রতি ৫০০ টাকারও বেশি। ফলে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের আমের দাম বিদেশি বাজারে প্রতিযোগী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশি পড়ে যাচ্ছে। এতে রপ্তানি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। রপ্তানিকারকরা বলছেন, গত বছর মোট খরচ ছিল প্রায় ৫০০ টাকার মধ্যে। তিন বছর আগে তা ছিল ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
কাওসার আহমেদ রুবেল বলেন, “এ অবস্থা চলতে থাকলে এ বছর রপ্তানি প্রায় শতভাগ কমে যেতে পারে। ভারত ও পাকিস্তানের মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর আমের দাম অনেক কম। স্বাদ ও গুণমান প্রায় একই হওয়ায় তাদের সঙ্গে আমরা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছি না।” তিনি আরও বলেন, “ভাড়ার কারণে তাদের তুলনায় বাংলাদেশের আম কেজিতে অন্তত ১ থেকে দেড় ডলার বেশি পড়ে যাচ্ছে। এছাড়া ওই দেশগুলোতে সরকার ফল রপ্তানি মৌসুমে আলাদা কার্গো বিমান চালু করে, আমাদের দেশে সেই সুবিধা নেই।”
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রপ্তানিযোগ্য আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, রপ্তানিকারকদের সমস্যার বিষয়ে তারা অবগত। তিনি জানান, বিষয়টি বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের কাছে উপস্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আগামী ২১ তারিখ এ বিষয়ে একটি বৈঠকে প্রস্তাব তোলা হবে। তিনি বলেন, “এবার আমের উৎপাদন ভালো। কিন্তু রপ্তানি ব্যাহত হলে চাষিরা ন্যায্য দাম পাবেন না। গত দুই বছরও নানা জটিলতায় রপ্তানি ভালো হয়নি। এবার বড় উদ্যোগ প্রয়োজন।”
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর দেশে ২ হাজার ১৯৪ টন আম রপ্তানি হয়েছে। এর আগের বছর ছিল ১ হাজার ৩২১ টন। তবে ২০২৩ সালে রপ্তানি ছিল ৩ হাজার ১০০ টন, যা এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ। ২০১৭ সালে রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৩০৯ টন।
বর্তমানে বাংলাদেশ ৩৮টি দেশে আম রপ্তানি করছে। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাজ্য, ইতালি, ফ্রান্স, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, সৌদি আরব, জার্মানি, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশ। গত বছর প্রথমবারের মতো চীনে আম রপ্তানি হয়। চলতি বছর মালয়েশিয়া, জাপান ও অস্ট্রেলিয়াও বাংলাদেশ থেকে আম আমদানিতে আগ্রহ দেখিয়েছে।
আম উৎপাদন প্রকল্পের পরিচালক আরিফুর রহমান বলেন, এ বছর উৎপাদন পরিস্থিতি ভালো থাকলেও রপ্তানি কিছুটা বাধাগ্রস্ত হতে পারে এমন আশঙ্কা রয়েছে। তবে উৎপাদন গত বছরের তুলনায় বাড়বে এবং নতুন রেকর্ডের সম্ভাবনাও আছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, এ বছর দুই লাখ সাত হাজার হেক্টর জমি থেকে ২৭ লাখ ৯৫ হাজার টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত বছর দুই লাখ পাঁচ হাজার হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছিল ২৬ লাখ ৬২ হাজার টন।
বর্তমানে দেশের ১৪টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে আম চাষ হচ্ছে। গোপালভোগ, হিমসাগর বা খিরসাপাত, ল্যাংড়া, আম্রপালি, ফজলি, হাঁড়িভাঙ্গা, গৌড়মতিসহ বিভিন্ন জাতের আম ১৫ মে থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ধাপে ধাপে বাজারে আসে। এ বছর এখন পর্যন্ত বড় কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না থাকায় উৎপাদন স্বাভাবিক রয়েছে। চাষিরা বলছেন, রপ্তানি কম হলেও স্থানীয় বাজারে ভালো দাম পাওয়া গেলে তারা মুনাফায় থাকবেন।

