ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সংরক্ষিত নারী আসনের ভোট শেষ হওয়ার পর এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচন ঘিরে প্রস্তুতি বাড়াচ্ছে নির্বাচন কমিশন। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ—এই পাঁচ স্তরের নির্বাচন সামনে রেখে নতুন পরিকল্পনা ও বিধিমালা সংশোধনের কাজ শুরু করেছে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি।
নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের শেষ দিক থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কার্যক্রম শুরু হতে পারে। তবে তার আগে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা ও আচরণবিধিতে পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে দলীয় প্রতীক ব্যবহারের ক্ষেত্রে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশ জারি করে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের ব্যবহার বন্ধ করে দেয়। পরে সেই অধ্যাদেশকে আইনে রূপ দেওয়া হয়। ফলে এখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন নির্দলীয় ভিত্তিতে আয়োজনের পথ পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন দেশের স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে। কারণ এতদিন স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও দলীয় প্রতীক বড় প্রভাব ফেলত। এখন ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, স্থানীয় গ্রহণযোগ্যতা ও সামাজিক প্রভাব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সম্প্রতি জেলা প্রশাসক সম্মেলনেও স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। সেখানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী এবং মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, সরকার এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সম্পন্ন করতে চায়।
একই সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন জেলা প্রশাসকদের নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেন। অন্য নির্বাচন কমিশনাররাও মাঠ প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকার বার্তা দিয়েছেন।
ইসি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিধিমালাও নতুনভাবে সাজানো হবে। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বিধিমালার খসড়া সংশোধনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম সরকার বলেছেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের জন্য বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিধিমালার সংশোধন শেষ হলেই তফসিল ঘোষণার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দেশের অধিকাংশ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ইউনিয়ন পরিষদ ছাড়া প্রায় সব প্রতিষ্ঠান প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। শুধু চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন-এ আদালতের আদেশে মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন শাহাদাত হোসেন।
আইন অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হয়। পৌরসভার ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ৯০ দিন। ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষেত্রেও মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে নির্বাচন আয়োজনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে, যদিও সেখানে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারিত নয়।
এখনো পর্যন্ত কোন স্তরের নির্বাচন আগে অনুষ্ঠিত হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম ইঙ্গিত দিয়েছেন, ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দিয়েই কার্যক্রম শুরু হতে পারে।
তবে নির্বাচন কমিশনের একটি অংশ মনে করছে, একসঙ্গে হাজারো ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন আয়োজন বর্তমান কমিশনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। সেই কারণে প্রথম ধাপে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের চিন্তাভাবনাও রয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, কোন স্তরের নির্বাচন আগে হবে সে বিষয়ে এখনো কমিশন আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত নেয়নি। আপাতত সার্বিক প্রস্তুতির কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুধু প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়, বরং দেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতারও বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে দলীয় প্রতীক ছাড়া নির্বাচন কেমন হয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে তার কী প্রভাব পড়ে, সেটিই এখন বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

