২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যার পর রাজধানীর পরিস্থিতি হঠাৎ অস্থির ও আতঙ্কময় হয়ে ওঠে। রাত গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একদল দুর্বৃত্ত হামলা চালায় দেশের ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটের ধানমণ্ডির ভবনে। এর আগে একই দিনে গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান বিন হাদি সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
সূত্রের অনুসন্ধানী সেলের সংগ্রহ করা বিভিন্ন সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, হামলার রাতে কয়েক শ মানুষ হুড়মুড় করে ছায়ানট ভবনে ঢুকে পড়ে। তাদের অধিকাংশের মুখ কালো কাপড়ে ঢাকা ছিল। কারো মাথায় ছিল হেলমেট। হামলাকারীদের হাতে লাঠিসোঁটা ও বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়।
ফুটেজে দেখা গেছে, হামলাকারীরা ছয়তলা ভবনের বিভিন্ন কক্ষে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর চালায়। একটি দল ভাঙচুরে অংশ নেয়, অন্য দল লুটপাটে জড়িত ছিল। পরে ভবনের সামনে আগুনও ধরিয়ে দেওয়া হয়।
এর পরদিন ১৯ ডিসেম্বর দেশের আরেক ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়েও হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।
শুধু ছায়ানট কিংবা উদীচী নয়, শান্তিতে নোবেলজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের শাসনামলে দেশের বিভিন্ন শিল্প-সংস্কৃতি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা, ভাঙচুর এবং কার্যক্রমে বাধা দেওয়ার একাধিক অভিযোগ উঠেছে।
ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ঘটনায় পৃথক দুটি মামলা হয়েছে। তবে চার মাস পেরিয়ে গেলেও হামলার নেপথ্যের পরিকল্পনাকারী বা সমন্বয়কারীদের এখনো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
ছায়ানটে হামলার পরদিন ধানমণ্ডি থানায় মামলা করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান ব্যবস্থাপক দুলাল ঘোষ। মামলায় ২৫০ থেকে ৩০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগে প্রায় দুই কোটি ৪০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

উদীচীতে হামলার দুই দিন পর শাহবাগ থানায় ১৪ থেকে ১৫ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেন সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন। তিনি অভিযোগ করেন, দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ধ্বংস, অরাজকতা সৃষ্টি এবং দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যেই এ হামলা চালানো হয়েছে। তার দাবি, হামলা, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।
উদীচী কার্যালয়ে হামলার আগে ধারণ করা দুটি সিসিটিভি ফুটেজও সূত্র সংবাদমাধ্যমের হাতে এসেছে। সেখানে দেখা যায়, আট থেকে ১০ জন যুবক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র হাতে ভবনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কয়েকজনের হাতে বস্তার মতো বস্তু ছিল বলেও ফুটেজে দেখা গেছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, যুবকদের দলটি ভবনে প্রবেশের কিছুক্ষণ পর আগুনের শিখা দেখা দেয়। পরে তাদের ভবন থেকে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়। তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভাষ্য, হামলাকারীদের অনেকের মুখ স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলার ঘটনা একই চক্রের পরিকল্পিত কর্মকাণ্ডের অংশ হতে পারে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হামলার বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এরই মধ্যে ছায়ানটে হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
ধানমণ্ডি থানার ওসি সাইফুল ইসলাম বলেন, ভিডিও ফুটেজ বিশ্লেষণ করে আরো কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, হামলার আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে ব্যাপক অপপ্রচার চালানো হয়। প্রকাশ্যে উসকানিমূলক বক্তব্যও দেওয়া হয়েছিল। তদন্তকারীদের ধারণা, এসব কর্মকাণ্ডের পেছনে স্বার্থান্বেষী মহল, উগ্রপন্থী গোষ্ঠী, অর্থদাতা এবং প্রচার-সহযোগীদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তবে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আরো তথ্য-প্রমাণ ও সমন্বিত তদন্ত প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের উপকমিশনার এবং গণমাধ্যম ও জনসংযোগ বিভাগের মুখপাত্র এন এম নাসির উদ্দিন বলেন, দুটি মামলার তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে কিছু হামলাকারীকে শনাক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি হামলার পরিকল্পনাকারী, অর্থায়নকারী ও সংগঠকদের চিহ্নিত করার কাজও চলছে। তিনি জানান, তদন্ত শেষ করতে আরো সময় লাগবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সরাসরি হামলায় অংশ নেওয়া কয়েকজনকে শনাক্ত করা গেলেও নেপথ্যের সমন্বয়কারী ও অর্থদাতাদের বিষয়ে এখনো স্পষ্ট তথ্য মেলেনি। হামলার আগে কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল, কারা অনলাইনে উসকানি দিয়েছে এবং কোনো রাজনৈতিক বা সংগঠিত গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা ছিল কি না—এসব বিষয়ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শুধু মাঠপর্যায়ের হামলাকারীদের নয়, উসকানিদাতা ও পরিকল্পনাকারীদের ভূমিকাও গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। এ কারণেই তদন্ত দীর্ঘায়িত হচ্ছে এবং এখনো অভিযোগপত্র জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি।
নাট্যজন মামুনুর রশীদ বলেন, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন দীর্ঘদিন ধরে অসাম্প্রদায়িক চেতনা, মুক্তবুদ্ধি এবং মানবিক মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করে আসছে। তার মতে, এই অঙ্গনকে দুর্বল করা গেলে সমাজের প্রগতিশীল ধারাকেও আঘাত করা সহজ হয়। তিনি মনে করেন, ছায়ানট, উদীচী এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলার ঘটনাগুলো একই ধারাবাহিকতার অংশ।
ইংরেজি দৈনিক নিউ এজ-এর সম্পাদক নুরুল কবির বলেন, হামলার আগে থেকেই প্রকাশ্যে এসব প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। তার অভিযোগ, কারা এ ধরনের ঘোষণা দিয়েছে তা সরকারও জানে। তিনি দাবি করেন, সরকার চাইলে আগেই ব্যবস্থা নিতে পারত।
আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মী সারা হোসেন বলেন, ছায়ানট ও উদীচীতে হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তার ভাষায়, মুক্তিযুদ্ধের সময় যেভাবে দেশের মেধা, মনন ও সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করতে শিল্পী, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীদের টার্গেট করা হয়েছিল, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর সাম্প্রতিক হামলাগুলোও সেই ধরনের মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। তিনি বলেন, এসব হামলার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-সংস্কৃতির মানুষকে স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। সূত্র: কালের কণ্ঠ

