দেশে মোবাইল ফোন সেবা এখন দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। যোগাযোগ, ব্যবসা, শিক্ষা, বিনোদন থেকে শুরু করে ডিজিটাল সেবার প্রায় সব ক্ষেত্রেই এর ব্যবহার বাড়ছে। কিন্তু এই খাত থেকে অর্জিত প্রতি ১০০ টাকার আয়ের মধ্যে প্রায় ৫৬ টাকাই কর, শুল্ক ও বিভিন্ন ফি হিসেবে সরকারের কোষাগারে চলে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন গ্রাহকদের বাড়তি খরচ গুনতে হচ্ছে, অন্যদিকে অপারেটরগুলোর বিনিয়োগ সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সংঘ দিবসকে সামনে রেখে আবারও আলোচনায় এসেছে দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের উচ্চ করভার ও সেবার ব্যয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সরকার টেলিযোগাযোগ খাতকে সহজ রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে ব্যবহার করেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব এখন পড়ছে ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণ ও ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর।
বর্তমানে মোবাইল সেবায় গ্রাহকদের ১৮ শতাংশ ভ্যাট, ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক এবং ১ শতাংশ সারচার্জ দিতে হয়। সব মিলিয়ে সরাসরি করের বোঝা দাঁড়ায় প্রায় ৩৯ শতাংশ। এছাড়া নতুন সিম কিনতে বা হারানো সিম পুনরায় তুলতে গুনতে হয় ৩০০ টাকা। অন্যদিকে অপারেটরগুলোর মুনাফার ওপর করহার ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত।
শুধু কর নয়, মোবাইল অপারেটরগুলোকে উচ্চমূল্যে তরঙ্গ বা স্পেকট্রাম কিনতে হয় এবং নির্দিষ্ট সময় পর তা নবায়নও করতে হয়। উদাহরণ হিসেবে, সম্প্রতি একটি অপারেটর ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গ কিনেছে প্রতি মেগাহার্টজ ২৩৭ কোটি টাকা দরে। এতে তাদের ব্যয় হয়েছে দুই হাজার কোটিরও বেশি টাকা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগি বাবদ দিতে হয় সাড়ে ৫ শতাংশ। সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিলেও জমা দিতে হয় আরও ১ শতাংশ। সব মিলিয়ে অপারেটরদের মোট আয়ের বড় অংশই চলে যায় সরকারি বিভিন্ন খাতে।
মোবাইল অপারেটরদের বৈশ্বিক সংগঠন জিএসএমএর তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে টেলিযোগাযোগ খাতে গড় করভার প্রায় ২২ শতাংশ। এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে এই হার ২৫ শতাংশের কাছাকাছি। সেই তুলনায় বাংলাদেশে কর ও ফি’র চাপ অনেক বেশি।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অতিরিক্ত কর ও ব্যয়ের কারণে অপারেটরগুলো নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, নেটওয়ার্ক উন্নয়ন এবং সেবার মান বাড়াতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ করতে পারছে না। ফলে ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
একটি শীর্ষ মোবাইল অপারেটরের করপোরেট কর্মকর্তার ভাষ্য, গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষা এবং ডিজিটাল সেবা আরও বিস্তৃত করতে হলে করহার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। এতে শুধু গ্রাহকই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও লাভবান হবে।
অন্য এক অপারেটরের কর্মকর্তা জানান, কর ও বাধ্যতামূলক পরিশোধ মিলিয়ে কার্যকর ব্যয়ের হার ৭০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। এতে ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। গত দেড় দশক ধরেই টেলিযোগাযোগ শিল্প এমন চাপের মধ্যে রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এ বছর আবারও অপারেটরগুলোকে আগের কেনা তরঙ্গ নবায়ন করতে হবে। এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হচ্ছে প্রায় ১৬ হাজার ৮৫০ কোটি টাকা। এর ওপর আলাদাভাবে ভ্যাটও দিতে হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই বিপুল ব্যয় শেষ পর্যন্ত গ্রাহকের ওপরই চাপতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চ কর ও সেবার বাড়তি ব্যয়ের কারণে দেশে স্মার্টফোন ও মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারের প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ এখনো নিয়মিত মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার থেকে পিছিয়ে রয়েছেন।
জিএসএমএর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত দেশে সক্রিয় মোবাইল গ্রাহক কমেছে প্রায় এক কোটি। একই সময়ে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী কমেছে এক কোটিরও বেশি। সংগঠনটির ধারণা, সিম ও সেবার ওপর অতিরিক্ত করই এর অন্যতম কারণ।
এদিকে সরকার করহার পুনর্বিবেচনার ইঙ্গিত দিয়েছে। সম্প্রতি এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, সব সমস্যা একসঙ্গে সমাধান করা না গেলেও ধাপে ধাপে কর সমন্বয়ের মাধ্যমে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনার চেষ্টা করা হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে মোবাইল ও ইন্টারনেট সেবাকে আরও সাশ্রয়ী করতে হবে। অন্যথায় উচ্চ কর ও ব্যয়ের কারণে সাধারণ মানুষ ডিজিটাল সুবিধা থেকে পিছিয়ে পড়বে, আর দেশের ডিজিটাল রূপান্তরও ধীর হয়ে যাবে।

