রাজধানীতে হামলা ও অগ্নিসংযোগে পুড়ে গেছে দেশের অন্যতম প্রাচীন সাংস্কৃতিক সংগঠন উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর বহু বছরের ইতিহাস, নথিপত্র ও সাংস্কৃতিক আর্কাইভ। সংগঠনটির নেতাকর্মী ও সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা নয়, বরং দেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও মুক্তচিন্তার ওপর বড় আঘাত।
ঘটনাটি ঘটে ২০২৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় রাজধানীর তোপখানা সড়কে অবস্থিত উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। এর এক দিন আগে হামলার শিকার হয় আরেক সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ছায়ানট। পরপর দুই প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় দেশজুড়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, সেদিন সন্ধ্যার পর একদল যুবক লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ভবনে প্রবেশ করে। পরে তারা কার্যালয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট চালানোর পর বিভিন্ন কক্ষে আগুন ধরিয়ে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সিসিটিভি ফুটেজেও হামলাকারীদের ভবনে ঢুকতে দেখা যায় বলে দাবি করা হয়েছে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কয়েকটি ইউনিট ঘটনাস্থলে পৌঁছে প্রায় দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে ততক্ষণে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ে যায়।
পাঁচতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় ছিল উদীচীর কেন্দ্রীয় কার্যালয়। সেখানে সংরক্ষিত ছিল সংগঠনটির কয়েক দশকের নথিপত্র, সাংগঠনিক দলিল, বই, পোস্টার, ব্যানার, কম্পিউটার এবং গুরুত্বপূর্ণ আর্কাইভ। আগুনে পুড়ে যায় নাটকের একাধিক মঞ্চসজ্জা ও সাংস্কৃতিক উপকরণও।
সংগঠনটির নেতারা জানান, উদীচীর ৫৭ বছরের সাংগঠনিক ইতিহাসের বড় অংশ ওই কার্যালয়েই সংরক্ষিত ছিল। আন্দোলন-সংগ্রামের নথি, সভার সিদ্ধান্ত, সাংস্কৃতিক কর্মসূচির দলিলসহ বহু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র আগুনে ধ্বংস হয়ে গেছে।
উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর একাংশের সাধারণ সম্পাদক জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, আগুন লাগার খবর পাওয়ার পর তিনি দ্রুত ঘটনাস্থলে যান। তখন ভবনের ভেতরে আগুন জ্বলছিল এবং পরে ফায়ার সার্ভিস এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে সাংস্কৃতিক আন্দোলন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও গণমানুষের পক্ষে কাজ করে আসছে। দেশের প্রায় সব জেলায় সংগঠনটির শাখা রয়েছে। সংগঠনটির নেতাদের দাবি, শুধু রাজধানী নয়, বিভিন্ন জেলায়ও তাদের শাখা কার্যালয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে।
নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ এই হামলাকে পরিকল্পিত আক্রমণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, এসব হামলার লক্ষ্য ছিল দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং প্রগতিশীল ধারাকে দুর্বল করা। তিনি বলেন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আঘাত মানে শুধু স্থাপনায় হামলা নয়, বরং জাতির ইতিহাস ও মননের ওপরও আঘাত।
সাংবাদিক নুরুল কবির দাবি করেন, হামলার আগে থেকেই বিভিন্ন মাধ্যমে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের হুমকি দেওয়া হচ্ছিল। তার অভিযোগ, আগাম সতর্কতার পরও হামলা ঠেকাতে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।
মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী সারা হোসেন বলেন, এই ধরনের হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। তার মতে, অতীতে যেমন বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মীদের লক্ষ্য করে আক্রমণ চালানো হয়েছিল, তেমনি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এখন আঘাতের মুখে ফেলা হচ্ছে। উদ্দেশ্য হলো সাংস্কৃতিক পরিসরকে ভয় ও চাপের মধ্যে রাখা।
সংস্কৃতিকর্মীরা বলছেন, দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গন দীর্ঘদিন ধরে মানবিকতা, মুক্তচিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধের পক্ষে কাজ করে এসেছে। ফলে এই পরিসর দুর্বল হয়ে পড়লে সমাজের প্রগতিশীল ধারাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
তাদের দাবি, হামলার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।
সূত্র: কালের কণ্ঠ

