বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জন্য যুক্তরাজ্য থেকে কেনা পাঁচটি সি–১৩০ জে সুপার হারকিউলিস সামরিক পরিবহন উড়োজাহাজের প্রকৃত মূল্য কত ছিল, সে তথ্য প্রকাশ করেনি ব্রিটিশ সরকার। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় করা এক আবেদনের জবাবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তির আর্থিক বিস্তারিত প্রকাশ করা হলে তাদের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা বাণিজ্য ও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, প্রতিরক্ষা খাতে যেকোনো বড় চুক্তির মূল্য ও ব্যয় কাঠামো প্রকাশ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাজ্যের দরকষাকষির সক্ষমতা কমে যেতে পারে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিরক্ষা শিল্প অংশীদাররাও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। এ কারণ দেখিয়েই বাংলাদেশকে বিক্রি করা উড়োজাহাজগুলোর দামের তথ্য গোপন রাখা হয়েছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে দেওয়া পাঁচটি পরিবহন উড়োজাহাজ ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরের মধ্যে ধাপে ধাপে হস্তান্তর করা হয়। এর মধ্যে দুটি উড়োজাহাজ আসে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে, একটি ২০১৯ সালের জুনে এবং বাকি দুটি একই বছরের সেপ্টেম্বরে। উড়োজাহাজগুলো ব্রিটিশ রয়্যাল এয়ার ফোর্স থেকে অবসরে নেওয়ার পর বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়।
উড়োজাহাজগুলোর সিরিয়াল নম্বরও প্রকাশ করা হয়েছে। এগুলো দীর্ঘদিন ব্রিটিশ বিমানবাহিনীর পরিবহন বহরে ব্যবহৃত ছিল এবং প্রায় দুই দশক ধরে সেবা দিয়েছে। পরে আধুনিক এয়ারবাস এ–৪০০এম পরিবহন বিমান যুক্ত হওয়ার কারণে পুরোনো হারকিউলিস সিরিজ ধাপে ধাপে সরিয়ে নেওয়া হয়।
তথ্য অধিকার আইনের আওতায় জবাবে যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা দপ্তর জানায়, চুক্তিতে কেবল উড়োজাহাজের বিক্রয়মূল্য নয়, বরং সংস্কার ব্যয়, প্রশিক্ষণ, যন্ত্রাংশ সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং অন্যান্য সহায়তা খরচসহ পুরো আর্থিক কাঠামোর তথ্য রয়েছে। তবে এসব কোনো তথ্যই জনসমক্ষে প্রকাশযোগ্য নয় বলে তারা জানিয়েছে। সিদ্ধান্তের আগে ‘জনস্বার্থ মূল্যায়ন’ করা হলেও শেষ পর্যন্ত বাণিজ্যিক গোপনীয়তার দিকটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
এছাড়া প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, দরপত্র প্রক্রিয়ার সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রতিযোগিতায় অন্য দেশ বা প্রতিষ্ঠান অযথা সুবিধা পেতে পারে। এ ধরনের নথি দীর্ঘদিনের নীতিমালা অনুযায়ী গোপন রাখা হয়।
অন্যদিকে হাউস অব কমন্সে করা প্রাথমিক তথ্য অনুরোধে জানানো হয়, ওই সংক্রান্ত বিস্তারিত নথি তাদের কাছে নেই। পরে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি তাদের এখতিয়ারভুক্ত বলে নিশ্চিত করে।
বিশ্লেষকদের ধারণা অনুযায়ী, সংস্কার ও আধুনিকায়ন করা এমন প্রতিটি সি–১৩০ জে উড়োজাহাজের বাজারমূল্য সাধারণত আড়াই কোটি থেকে সাড়ে তিন কোটি মার্কিন ডলারের মধ্যে হতে পারে। যদিও সরকারি তথ্য না থাকায় প্রকৃত ব্যয় নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।
একই ধরনের উড়োজাহাজ পরে তুরস্কও যুক্তরাজ্য থেকে কিনেছে। ওই চুক্তিতে শুধু বিমান নয়, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণসহ বড় একটি সহায়তা প্যাকেজও অন্তর্ভুক্ত ছিল। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষণ অনুযায়ী, পুরো প্রকল্পের ব্যয় কয়েকশ কোটি ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে উড়োজাহাজগুলো বিমানবাহিনীর পরিবহন সক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে চুক্তির প্রকৃত আর্থিক পরিমাণ প্রকাশ না হওয়ায় এ নিয়ে স্বচ্ছতা ও ব্যয় কাঠামো ঘিরে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

