গঙ্গা নদীর পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষের পর ভবিষ্যৎ কাঠামো কী হবে—তা অনেকটাই নির্ভর করছে ঢাকা–দিল্লির রাজনৈতিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক সমঝোতার ওপর। তবে এর মধ্যেও যৌথ নদী কমিশন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো চুক্তি নবায়নের প্রস্তুতি ও কারিগরি কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগামী ডিসেম্বরে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হবে। তাঁর মতে, এটি মূলত দুই দেশের রাজনৈতিক বিষয়। তাই পরবর্তী চুক্তি কীভাবে হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের সরকারের সম্পর্ক ও সমঝোতার ওপর। তবে তিনি জানান, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং যৌথ নদী কমিশন নিয়মিত কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। পাশাপাশি পানি বণ্টনের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণে দুই দেশের বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর যৌথ নদী কমিশনের একটি নিয়মিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৮ এপ্রিল ঢাকায় অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে ভারতীয় পক্ষকে জানানো হয়, চুক্তি নবায়নের লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রস্তুতি বাংলাদেশ সম্পন্ন করেছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে চারজন প্রতিনিধি নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারতীয় পক্ষ প্রস্তুতি সম্পন্ন করলে কমিটি গঠন হবে। জুন মাসের মাঝামাঝি এই যৌথ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে যৌথ নদী কমিশনের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বর্তমান চুক্তির তুলনায় বেশি সুবিধা পাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আলোচনা রয়েছে। সে লক্ষ্যে গঙ্গা পানি বণ্টন ব্যবস্থায় নতুন কিছু উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়েও কাজ চলছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সাবেক মহাপরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘের নীতিমালা অনুযায়ী কোনো আন্তর্জাতিক নদীর পানি একতরফাভাবে বন্ধ করা যায় না।
তিনি আরও বলেন, জাতিসংঘের নীতিমালায় আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বণ্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিত করার বিষয়টি স্পষ্টভাবে বলা আছে। ফলে কোনো না কোনো কাঠামোয় দুই দেশই গঙ্গার পানি বণ্টনে সমঝোতায় পৌঁছাবে। মাহফুজুর রহমান বলেন, পদ্মা ব্যারাজ বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। তাঁর মতে, কোনো কারণে গঙ্গা থেকে পর্যাপ্ত পানি না এলে পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে সেই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে।
বর্তমানে বাংলাদেশের একটি কারিগরি কমিটি ভবিষ্যৎ পানি বণ্টনের রূপরেখা তৈরির কাজ করছে। এই কমিটি গঙ্গার পাশাপাশি আরও ১৪টি নদীর পানি বণ্টনের বিষয়েও কাজ করছে। কমিটি গত ৩০ বছরের চুক্তির প্রভাব এবং গঙ্গার পানিপ্রবাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করছে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উৎস অঞ্চল থেকে শুরু করে এ অঞ্চলের নদী ও কৃষিখাতে কী পরিবর্তন এসেছে, তাও পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাসও বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এসব বিশ্লেষণের ভিত্তিতে সরকার ও বিশেষজ্ঞ কমিটির জন্য সুপারিশ তৈরি করা হবে, যার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী চুক্তির কাঠামো নির্ধারণ করা হবে। চলমান চুক্তির আওতায় পানি বণ্টন ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশের একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে ফারাক্কায় অবস্থান করছে। আগামী ২০ মে আরেকটি দল সেখানে পর্যবেক্ষণে যাবে। একই সময়ে ভারতীয় একটি প্রতিনিধি দল হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পয়েন্টে পানিপ্রবাহ পর্যবেক্ষণ করবে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। তবে গঙ্গা ছাড়া অন্য কোনো নদীর পানি বণ্টনে এখনো চুক্তি হয়নি। তিস্তার পানি বণ্টন দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় থাকলেও পশ্চিমবঙ্গের আপত্তির কারণে তা বাস্তবায়ন হয়নি। কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, গোমতী, খোয়াই, মনু ও মুহুরীসহ মোট ১৪টি নদীর পানি বণ্টন চুক্তির প্রস্তাব তোলা হবে।
উত্তেজনার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট:
১৯৭৫ সালে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ফারাক্কায় গঙ্গা নদীর ওপর ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হয়। এরপর থেকেই গঙ্গার পানি বণ্টন দুই দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে ওঠে। বাংলাদেশের নদী, কৃষি, অর্থনীতি ও ভূরাজনীতিতে এর গভীর প্রভাব রয়েছে। অনেক নদী পানির ঘাটতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, আবার কখনো কখনো অতিরিক্ত পানি প্রবাহে বন্যাও দেখা দিয়েছে।
ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী রাজশাহী থেকে ফারাক্কা অভিমুখে লংমার্চ করেন। দিনটি এখনো বাংলাদেশে ঐতিহাসিক ফারাক্কা লংমার্চ দিবস হিসেবে পালিত হয়।
চুক্তির মেয়াদ শেষের প্রাক্কালে এই ইস্যু আবারও রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক অনেকাংশেই নির্ভর করবে গঙ্গা বা ফারাক্কা চুক্তির বাস্তবায়নের ওপর। গত ১৩ মে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি বলেন, প্রযুক্তিগত দল কাজ করছে এবং এ বছরই চুক্তি পর্যালোচনার আশা রয়েছে। তাঁর মতে, ৩০ বছরের চুক্তি অব্যাহত থাকবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান পদ্মা ব্যারাজ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, এটি তিস্তার বিকল্প নয়। তিস্তার ন্যায্য পানির অধিকার অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে। গত ৪ মে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি দিল্লিতে বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধিদলের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে তিনি জানান, চুক্তি নবায়ন পর্যালোচনায় যৌথ নদী কমিশন ও বিশেষজ্ঞরা যথাসময়ে অংশ নেবেন।
চুক্তির মূল কাঠামো:
১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে গঙ্গা পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী এইচ ডি দেবগৌড়া এবং বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩০ বছরের জন্য এই চুক্তি করেন।
চুক্তির ১২ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, এটি স্বাক্ষরের পর কার্যকর হয়ে ৩০ বছর বলবৎ থাকবে। পরবর্তীতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নবায়ন করা যাবে।
চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় গঙ্গার প্রবাহ দুই দেশ ভাগ করে নেয়। যদি পানির প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত হয়, তাহলে দুই দেশ সমান ভাগ পায়। অর্থাৎ ৫০ শতাংশ করে।
যদি প্রবাহ ৭০ হাজার কিউসেকের বেশি কিন্তু ৭৫ হাজার কিউসেক পর্যন্ত হয়, তাহলে বাংলাদেশ সর্বোচ্চ ৩৬ হাজার কিউসেক পায় এবং বাকি অংশ পায় ভারত। আর যদি প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হয়, তাহলে ভারত ৪০ হাজার কিউসেক রেখে বাকি পানি বাংলাদেশকে দেয়।
এই বণ্টন প্রতি ১০ দিনের হিসাব অনুযায়ী করা হয়। চুক্তিতে আরও বলা আছে, ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত সময়ে ১০ দিন করে বাংলাদেশ ও ভারত নিশ্চিতভাবে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি পাবে।

