কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়নে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ অলওয়েদার সড়কটি ভয়াবহ নদীভাঙনের কবলে পড়ে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক বিলীন হয়ে গেছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। এতে নোয়াগাঁও ও উসমানপুর গ্রামের যোগাযোগ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে, পাশাপাশি বিদ্যুৎ লাইন ভেঙে দুটি গ্রাম অন্ধকারে ডুবে গেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে নদীভাঙন চললেও কার্যকর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে এখন ভাঙন সরাসরি সড়ক কাঠামো পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। এই সড়কটি শুধু স্থানীয় জনগণের জন্য নয়, পার্শ্ববর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর এলাকার মানুষেরও গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগ পথ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০১৭ সালে প্রায় ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০ দশমিক ৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই সড়কটি নির্মাণ করা হয়। হাওর এলাকার পানিবেষ্টিত পরিবেশ বিবেচনায় এটি উঁচু করে নির্মাণ করা হলেও নদীর প্রবল ভাঙন ঠেকাতে স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে নদী সড়কের দিকে এগিয়ে আসে।
এ বছর সড়ক রক্ষায় ১৩ কোটি টাকার একটি সংস্কার প্রকল্প শুরু হলেও তা ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। এরই মধ্যে সড়কটির শেষ প্রান্তে প্রায় ১৭৭ কোটি টাকার একটি সেতু নির্মাণাধীন রয়েছে, যা ভবিষ্যতে এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়ার কথা ছিল। ভাঙনের কারণে নোয়াগাঁও গ্রামের বহু পরিবার ইতিমধ্যে ঘরবাড়ি ও কৃষিজমি হারিয়েছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, দুই বছরে কয়েক শ একর ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ও বাসিন্দারা জানান, একাধিকবার সংশ্লিষ্ট দপ্তরে অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মধ্যে দায়িত্ব নিয়ে মতবিরোধ ও পরস্পরকে দায় চাপানোর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। একজন স্থানীয় কৃষক বলেন, সামান্য জিও ব্যাগ ফেলে এ ধরনের ভয়াবহ ভাঙন থামানো সম্ভব নয়। স্থায়ী সমাধানের জন্য সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন, নইলে পুরো গ্রামই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নদীঘেঁষা এই সড়কে শুরু থেকেই পর্যাপ্ত প্রতিরক্ষা কাঠামো না থাকায় ভাঙন দ্রুত বেড়েছে। অন্যদিকে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের দাবি, নদীর গতিপথ পরিবর্তন এবং প্রাকৃতিক কারণে ভাঙন বেড়েছে, যা নিয়ন্ত্রণে শিগগিরই নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওর অঞ্চলের অবকাঠামো পরিকল্পনায় নদীর গতিপ্রকৃতি ও ভাঙন ঝুঁকি যথাযথভাবে বিবেচনা না করলে এমন ক্ষতি বারবার ঘটতে পারে। ফলে শুধু অস্থায়ী সংস্কার নয়, দীর্ঘমেয়াদি নদী নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা পরিকল্পনা জরুরি হয়ে পড়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে স্থানীয়রা দ্রুত স্থায়ী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন, না হলে গুরুত্বপূর্ণ এই যোগাযোগ সড়ক সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

