নগরের রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল ও ক্যাফেতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বাধ্যতামূলকভাবে প্রবেশযোগ্য অবকাঠামো না থাকলে ট্রেড লাইসেন্স বাতিল বা নবায়ন বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে র্যাম্প ও ব্যবহারযোগ্য টয়লেট নিশ্চিত না করলে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে দেশের নগরাঞ্চলের বাণিজ্যিক সেবা খাতে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আসছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। দীর্ঘদিন ধরে হুইলচেয়ার ব্যবহারকারীসহ বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধী মানুষ রেস্তোরাঁ, হোটেল ও ক্যাফেতে প্রবেশ ও ব্যবহারে বাধার মুখে পড়ছিলেন। মূলত সিঁড়িনির্ভর প্রবেশপথ, সংকীর্ণ দরজা এবং উপযোগী টয়লেট না থাকাই এই সমস্যার প্রধান কারণ।
স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে দেশের সব সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, সম্প্রতি উচ্চপর্যায়ের একটি সভায় নগর সেবাকে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক করার বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব পায়। সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে ও হোটেলের প্রবেশপথে বাধাহীন প্রবেশের জন্য উপযুক্ত ঢালসহ র্যাম্প থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ব্যবহারযোগ্য টয়লেটও নিশ্চিত করতে হবে। এসব শর্ত পূরণ না করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন স্থগিত বা বাতিল করা হবে।
সরকারি নীতিনির্ধারকেরা বলছেন, বিষয়টি এখন আর শুধু অবকাঠামোর মানের প্রশ্ন নয়, এটি নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সুযোগ-সুবিধা না থাকা মানে সামাজিক অংশগ্রহণ থেকে একটি বড় অংশকে কার্যত দূরে রাখা।
জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থার জরিপ অনুযায়ী, দেশের মোট জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কোনো না কোনো ধরনের প্রতিবন্ধিতার সঙ্গে বসবাস করে। শহরাঞ্চলেও এই হার কম নয়। ফলে নগরের রেস্তোরাঁ ও সেবা খাতে প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আইন অনুযায়ী, গণস্থাপনায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের চলাচল, প্রবেশ ও সেবা গ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি ভবন নির্মাণ বিধিমালাতেও সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য অবকাঠামোর নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে অনেক বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে এসব নিয়ম পুরোপুরি মানা হয় না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, অনেক ক্ষেত্রে নামমাত্র র্যাম্প তৈরি করা হলেও তা ব্যবহারযোগ্য হয় না। কোথাও ঢাল বেশি খাড়া, কোথাও জায়গার অভাব, আবার কোথাও টয়লেট থাকলেও তা হুইলচেয়ার ব্যবহার উপযোগী নয়। ফলে কাগজে-কলমে সুবিধা থাকলেও বাস্তবে তা কাজে আসে না।
নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে সিটি করপোরেশনগুলোকে লাইসেন্স প্রদান ও নবায়নের সময় সরেজমিন যাচাই করতে হবে। এতে নতুন প্রতিষ্ঠানগুলো শুরু থেকেই প্রতিবন্ধীবান্ধব নকশা অনুসরণে বাধ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে। পুরোনো প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধাপে ধাপে মানদণ্ড পূরণ করতে হবে।
নগর প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সহজ হবে না। কারণ হাজারো রেস্তোরাঁ ও হোটেলের অবকাঠামো একযোগে পরিবর্তন করা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। তবে দীর্ঘমেয়াদে এটি নগরের সেবা খাতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করবে।
প্রতিবন্ধী অধিকার নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা এই সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, শুধু নীতি ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নের কঠোর নজরদারি থাকলেই প্রকৃত পরিবর্তন আসবে। অন্যথায় আগের মতোই কাগুজে নিয়মে সীমাবদ্ধ থেকে যাবে উদ্যোগটি।
সরকার বলছে, নগরের প্রতিটি নাগরিকের সমান সুযোগ নিশ্চিত করাই এই নীতির মূল লক্ষ্য। একজন মানুষ যেন রেস্তোরাঁ বা হোটেলে প্রবেশ করতে গিয়ে অবকাঠামোগত বাধার কারণে পিছিয়ে না পড়েন, সেটিই এখন নতুন নগর ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ মানদণ্ড হিসেবে দেখা হচ্ছে।

