দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এখন নতুন করে জনস্বাস্থ্য উদ্বেগ তৈরি করেছে। মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময়ে হাম ও এর উপসর্গে শিশুমৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে চার শ ছাড়িয়ে গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৃত্যুর এই দ্রুত ঊর্ধ্বগতি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা ও টিকাদান সংকটকে সামনে এনে দিয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত নিশ্চিত হাম ও উপসর্গ মিলিয়ে ৪৫৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৭৪ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছিল, আর ৩৭৯ জন উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে। একই সময়ে আক্রান্ত ও উপসর্গ শনাক্ত হওয়া শিশুর সংখ্যা ৬৪ হাজার ছাড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক দশকে এত অল্প সময়ে শিশুদের মধ্যে সংক্রামক রোগে মৃত্যুর এমন দ্রুত বিস্তার দেখা যায়নি। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, দেশে করোনাভাইরাস শনাক্ত হওয়ার পর প্রথম ৬৩ দিনে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৩১৪। অথচ হামের বর্তমান প্রাদুর্ভাবে ৬২ দিনের মধ্যেই মৃত্যুর সংখ্যা তা অতিক্রম করেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকেরা বলছেন, করোনা, ডেঙ্গু ও হাম—এই তিন রোগের প্রকৃতি ভিন্ন হলেও প্রাদুর্ভাবের গতি ও স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ বিশ্লেষণে তুলনামূলক হিসাব গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের মতে, হামের ক্ষেত্রে যে ধরনের দ্রুত সংক্রমণ ও মৃত্যুহার দেখা যাচ্ছে, সেটি ‘র্যাপিড স্পাইক’-এর লক্ষণ। সাধারণত টিকাদানে ঘাটতি, অপুষ্টি, দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতা এবং চিকিৎসাসেবায় বিলম্ব হলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
দেশে ফেব্রুয়ারি থেকে হামের বিস্তার শুরু হলেও মার্চে তা দ্রুত বাড়তে থাকে। এরপর থেকে প্রতিদিন আক্রান্ত, উপসর্গ ও মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, প্রত্যন্ত অঞ্চলে আরও অনেক আক্রান্ত ও মৃত্যুর ঘটনা সরকারি পরিসংখ্যানে যুক্ত হয়নি।
সরকারি হিসাবে এখন পর্যন্ত ৫৬ হাজারের বেশি শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ৪১ হাজারের বেশি শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। চিকিৎসা শেষে অনেকেই বাড়ি ফিরলেও নতুন আক্রান্তের সংখ্যা এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
জনস্বাস্থ্যবিদেরা বলছেন, হাম একটি টিকানির্ভর প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে ঘাটতি, শিশুদের অপুষ্টি এবং মাতৃদুগ্ধপান কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে দরিদ্র ও অনগ্রসর অঞ্চলে ঝুঁকি আরও বেশি।
বাংলাদেশ চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ–এর পরিচালক ও বক্ষব্যাধি বিশেষজ্ঞ কাজী সাইফউদ্দীন বেন্নূর বলেন, হাম, করোনা ও ডেঙ্গুর সংক্রমণধারা এক নয়। তবে স্বল্প সময়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর দ্রুত বৃদ্ধি স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তাঁর মতে, টিকাদান ও শিশু পুষ্টির দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক এম এ ফয়েজ বলেন, করোনা ছিল সম্পূর্ণ নতুন রোগ, যার চিকিৎসা পদ্ধতি শুরুতে বিশ্বজুড়ে অনিশ্চিত ছিল। কিন্তু হাম বহু পুরোনো এবং প্রতিরোধযোগ্য রোগ হওয়া সত্ত্বেও এত বড় প্রাদুর্ভাব উদ্বেগজনক। তিনি মনে করেন, নজরদারি, টিকাদান এবং সমন্বিত প্রতিরোধব্যবস্থায় দুর্বলতার কারণেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট–এর উপদেষ্টা মুশতাক হোসেন বলেন, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার দুর্বলতা এবং সময়মতো রোগী শনাক্ত ও চিকিৎসা না পাওয়ার কারণে প্রতিরোধযোগ্য অনেক মৃত্যু ঘটছে। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসেবাকে বিকেন্দ্রীকরণ করে উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব।
শিশুস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন হাম নিয়ন্ত্রণে থাকায় নতুন চিকিৎসকদের মধ্যে এই রোগের জটিলতা মোকাবিলার বাস্তব অভিজ্ঞতা কমে গেছে। ফলে গুরুতর আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাতেও চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, দ্রুত টিকাদান জোরদার, পুষ্টি সহায়তা বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সমন্বিত প্রস্তুতি ছাড়া পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।

