দেশের ব্যাংক খাতে দুর্নীতি, ঋণ জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের অভিযোগে একের পর এক শীর্ষ ব্যাংকার গ্রেফতার হওয়ায় পুরো আর্থিক খাতে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। সাবেক চার ব্যাংক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। আরও ডজনখানেক সাবেক ও বর্তমান এমডির বিরুদ্ধে তদন্ত ও মামলা চলমান থাকায় ব্যাংক খাতজুড়ে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক।
একসময় রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক পিএলসি-এর প্রভাবশালী ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ। ২০১৭ সালের অক্টোবর থেকে টানা ছয় বছর দায়িত্ব পালন করা এই ব্যাংকার বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলায় কারাগারে আছেন। এননটেক্স গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারিতে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চলতি বছরের মার্চে আদালতে জামিন চাইতে গেলে তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
একইভাবে কারাগারে রয়েছেন ওবায়েদ উল্লাহ মাসুদ, যিনি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসি ও রূপালী ব্যাংক পিএলসি-এর সাবেক এমডি ছিলেন। গ্রেফতারের আগে তিনি ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-এর চেয়ারম্যান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বিরুদ্ধে অগ্রণী ব্যাংকের ১৮৯ কোটি টাকার ঋণ অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি অগ্রণী ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক থাকাকালে বিতর্কিত ওই ঋণ অনুমোদনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
প্রায় এক বছর ধরে কারাগারে আছেন ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি মনিরুল মওলা। তাঁর বিরুদ্ধে এক হাজার ৯২ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতে সহযোগিতার অভিযোগ আনা হয়েছে। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংক পিএলসি-এর সাবেক এমডি ফিরোজ হোসেন ছয় মাসের বেশি সময় ধরে কারাগারে রয়েছেন। দুদকের মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে ৮৫৭ কোটি টাকার ঋণ অনুমোদন, আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচারে সহায়তার অভিযোগ রয়েছে।
ব্যাংক খাতের অনিয়মে জড়িত থাকার দায়ে শীর্ষ ব্যাংকারদের কারাদণ্ড নতুন ঘটনা নয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উদাহরণ টেনে বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক আর্থিক সংকটের পর ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে বহু ব্যাংকারকে বিচারের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। গবেষণায় দেখা গেছে, ওই সংকটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্তত ৪৭ জন ব্যাংকার বিভিন্ন দেশে কারাদণ্ড পেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি সাজা হয়েছিল আইসল্যান্ডে, যেখানে ২৫ জন শীর্ষ ব্যাংকার জেলে গিয়েছিলেন।
স্পেনে আর্থিক খাত ধসের ঘটনায় ১১ ব্যাংকার সাজাপ্রাপ্ত হন। তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সাবেক আইএমএফ প্রধান রদ্রিগো রাতো। আয়ারল্যান্ডেও একাধিক ব্যাংকার কারাদণ্ড পান। যুক্তরাষ্ট্রে সাবপ্রাইম মর্টগেজ কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকার অভিযোগে এক ব্যাংকারকে ৩০ মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
এশিয়ার উদাহরণও সামনে আসছে। সিঙ্গাপুরের বড় মানি লন্ডারিং কেলেঙ্কারিতে সিটিব্যাংক সিঙ্গাপুর-এর সাবেক কর্মকর্তা ওয়াং কিমিং দুই বছরের কারাদণ্ড পান। প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের অবৈধ অর্থ লেনদেনের ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়েছিল।
বাংলাদেশেও এখন পরিস্থিতি দ্রুত বদলাচ্ছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, আরও অন্তত ১০ থেকে ১২টি ব্যাংকের সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ নির্বাহীর বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। বিভিন্ন মামলায় শুধু এমডিই নন, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, উপব্যবস্থাপনা পরিচালক, বিভাগীয় প্রধান ও শাখা ব্যবস্থাপকসহ বহু কর্মকর্তাকেও আসামি করা হচ্ছে।
দুদকের কর্মকর্তারা বলছেন, একটি বড় ঋণ অনুমোদনের পেছনে সাধারণত ১৫ থেকে ২০ কর্মকর্তা জড়িত থাকেন। ফলে প্রতিটি ঋণ কেলেঙ্কারির মামলায় বিপুলসংখ্যক ব্যাংকারের নাম আসছে। কোনো কোনো সাবেক এমডির বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা অর্ধশত ছাড়িয়ে যেতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের জনসংযোগ বিভাগের উপপরিচালক মো. আকতারুল ইসলাম বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও তদন্তের ভিত্তিতেই গ্রেফতার করা হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ব্যাংক খাতে সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির পরিমাণ এত বড় যে সবকিছু উদ্ঘাটন করতে সময় লাগবে।
তবে ব্যাংকারদের একটি অংশ মনে করছেন, পুরো দায় শুধু শীর্ষ নির্বাহীদের ওপর চাপানো ঠিক হচ্ছে না। সদ্য বিদায়ী ইস্টার্ন ব্যাংক পিএলসি-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলী রেজা ইফতেখার বলেন, অনেক সময় চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ কিংবা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে শীর্ষ নির্বাহীদের ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করা হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দায় নিতে হচ্ছে কেবল ব্যাংকারদেরই।
তিনি আরও বলেন, এই পরিস্থিতির কারণে অনেক যোগ্য ব্যাংকার এখন প্রধান নির্বাহী হতে আগ্রহ হারাচ্ছেন। এমনকি অনেক ব্যাংকার নতুন ঋণ অনুমোদনেও ভয় পাচ্ছেন। এর প্রভাব ইতোমধ্যে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধিতে পড়েছে বলে মনে করছেন তিনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এটি মোট বিতরণকৃত ঋণের প্রায় ৩০ শতাংশ। যদিও আগের বছরের সেপ্টেম্বরে এ হার আরও বেশি ছিল। পুনঃতফসিলের মাধ্যমে কিছু ঋণ সাময়িকভাবে নিয়মিত দেখানো হলেও বাস্তব চিত্র এখনো উদ্বেগজনক।
দেশের ৬২টি ব্যাংকের প্রায় অর্ধেক বর্তমানে আর্থিক ঝুঁকিতে রয়েছে বলে খাতসংশ্লিষ্টদের ধারণা। এর মধ্যে এক ডজন ব্যাংক আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতেও হিমশিম খাচ্ছে। একই সঙ্গে ২৪টি ব্যাংক বড় ধরনের মূলধন ঘাটতিতে পড়েছে।
শরিয়াহভিত্তিক পাঁচটি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করার উদ্যোগ নিয়েছিল সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার। এর মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি, ইউনিয়ন ব্যাংক পিএলসি ও গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক পিএলসি-এর নিয়ন্ত্রণ ছিল এস আলম গ্রুপের হাতে। আর এক্সিম ব্যাংক পিএলসি নিয়ন্ত্রণ করত নাসা গ্রুপ। বর্তমানে এসব ব্যাংকের কোনো কোনোটির খেলাপি ঋণ ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ মনে করেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ছাড়া এত বড় অনিয়ম সম্ভব নয়। তাঁর ভাষায়, ছোটখাটো দুর্নীতি একজন কর্মকর্তা করতে পারেন, কিন্তু বড় লুটপাট হয় চেয়ারম্যান, পরিচালনা পর্ষদ ও রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের যোগসাজশে।
বিশ্লেষকদের মতে, দেশের ব্যাংক খাত এখন ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। একদিকে দুর্নীতির বিচার, অন্যদিকে আস্থা পুনরুদ্ধার—দুই চ্যালেঞ্জই একসঙ্গে মোকাবিলা করতে হচ্ছে। সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে সংকট আরও গভীর হতে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা।

