দেশজুড়ে দ্রুত বাড়ছে অটোগ্যাস স্টেশনের সংখ্যা। তবে এর বড় অংশই চলছে পূর্ণাঙ্গ অনুমোদন ও নিরাপত্তা সনদ ছাড়া। খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, বর্তমানে দেশের প্রায় ১ হাজার ১০০ অটোগ্যাস স্টেশনের মধ্যে ৯০ শতাংশেরই নেই চূড়ান্ত লাইসেন্স বা বৈধ কাগজপত্র। ফলে প্রতিনিয়ত বাড়ছে দুর্ঘটনা ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অনেক স্টেশনে গ্যাস লিক শনাক্ত করার আধুনিক ডিটেকশন ব্যবস্থা নেই। কোথাও আবার ন্যূনতম নিরাপত্তা মানও অনুসরণ করা হচ্ছে না। এতে অটোগ্যাস খাত এখন বড় ধরনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
রাজধানীতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন ভবনে আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য উঠে আসে। ‘বাংলাদেশের এলপিজি খাতে বাড়তে থাকা নিরাপত্তা ও নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক আলোচনার আয়োজন করে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইয়াসির আরাফাত খান। তিনি বলেন, দেশের অধিকাংশ অটোগ্যাস স্টেশন শুধু প্রাথমিক অনুমোদনের ভিত্তিতে ব্যবসা করছে। পূর্ণাঙ্গ কমপ্লায়েন্স বা নিরাপত্তা শর্ত পূরণ না করেই এসব স্টেশন চালু হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।
তাঁর মতে, লাইসেন্স ব্যবস্থাকে একটি কেন্দ্রীয় তদারকি কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে সব স্টেশনকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে নিয়ন্ত্রক সংস্থায় দক্ষ জনবল বাড়ানোর পরামর্শও দেন তিনি। তা না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেন এই বিশেষজ্ঞ।
আলোচনায় মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, এলপিজি খাতে নিরাপত্তা নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিস্ফোরক পরিদপ্তর, বিইআরসি এবং খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তাদের সমন্বয়ে কার্যকর একটি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন অ্যান্ড কনভারশন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ সিরাজুল মাওলা জানান, বর্তমানে প্রায় ৭০০ অটোগ্যাস স্টেশন বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও বিইআরসির লাইসেন্স ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। দ্রুত এসব স্টেশনের লাইসেন্স জটিলতা সমাধানের দাবি জানান তিনি।
তাঁর অভিযোগ, বর্তমান নীতিমালা অনুযায়ী একটি স্টেশন স্থাপনের অনুমোদন নিতে গিয়ে উদ্যোক্তাদের বছরের পর বছর বিভিন্ন দপ্তরে ঘুরতে হয়। বিস্ফোরক পরিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও সড়ক বিভাগ—সব মিলিয়ে অনুমোদন প্রক্রিয়া অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। এতে সময়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ ব্যয়ও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, দেশে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে অটোগ্যাস খাতে। অধিকাংশ উদ্যোক্তা ক্ষুদ্র ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ী এবং বড় অংশই ব্যাংকঋণের মাধ্যমে বিনিয়োগ করেছেন। বর্তমানে প্রায় দুই লাখ যানবাহন এলপিজিতে রূপান্তর করা হয়েছে। কিন্তু নীতিগত জটিলতা ও অনিয়ন্ত্রিত বাজার ব্যবস্থার কারণে উদ্যোক্তা ও গ্রাহক উভয়েই ঝুঁকিতে পড়ছেন।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে জালাল আহমেদ বলেন, দেশে জ্বালানি সংকটের কারণে এলপিজি খাতের গুরুত্ব বাড়ছে। কিন্তু মুনাফার দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ায় নিরাপত্তা ইস্যু অনেক সময় অবহেলিত হচ্ছে। তিনি বলেন, নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার না দিলে ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয় ঘটতে পারে।
আলোচনায় আরও অংশ নেন বিইআরসির সদস্য সাঈদা সুলতানা রাজিয়া, মিজানুর রহমান, আলি আফজাল এবং ফায়ার সার্ভিস ও বিস্ফোরক পরিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘ক্রস ফিলিং’। অর্থাৎ অনুমোদনহীনভাবে এক সিলিন্ডার থেকে অন্য সিলিন্ডারে গ্যাস স্থানান্তর করা হচ্ছে, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এছাড়া যেখানে-সেখানে অটোগ্যাস স্টেশন স্থাপন করা হলেও কার্যকর নজরদারি নেই।
আবু সাঈদ রাজা বলেন, অটোগ্যাসের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নিরাপত্তা ঝুঁকিও বাড়ছে। তাঁর মতে, প্রাথমিক অনুমোদন নিয়ে পূর্ণাঙ্গ কমপ্লায়েন্স ছাড়াই ব্যবসা করার প্রবণতা বন্ধ না হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো কঠিন হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলপিজি খাতকে নিরাপদ ও টেকসই করতে হলে দ্রুত নীতিমালা সংশোধন, অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজীকরণ, ওয়ানস্টপ সার্ভিস চালু এবং কঠোর তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নিরাপত্তা মান না মানা স্টেশনগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

