পবিত্র হজকে কেন্দ্র করে সৌদি আরবে বাংলাদেশি হজযাত্রীদের যাত্রা এখন শেষ পর্যায়ে। প্রতিদিনই শত শত মানুষ জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ধর্মীয় সফরে অংশ নিতে ঢাকা ছাড়ছেন। ধর্মীয় আবেগ, দীর্ঘদিনের সঞ্চয় আর বহু প্রতীক্ষার পর মহান আল্লাহর ঘর দেখতে সৌদি আরবে পৌঁছাচ্ছেন হাজারো মুসল্লি। তবে এই আনন্দঘন যাত্রার মধ্যেই এসেছে কিছু বেদনাদায়ক খবরও। এখন পর্যন্ত হজ পালন করতে গিয়ে ১৭ জন বাংলাদেশি হজযাত্রীর মৃত্যু হয়েছে।
সোমবার (১৮ মে) হজ আইটি হেল্পডেস্ক প্রকাশিত ৩০তম বুলেটিনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। রবিবার (১৭ মে) রাত পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত মোট ৬২ হাজার ৫২৮ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী সৌদি আরবে পৌঁছেছেন। এর মধ্যে সরকারি ব্যবস্থাপনায় গেছেন ৪ হাজার ৪৪৪ জন এবং বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় গেছেন ৫৮ হাজার ৮৪ জন। সংখ্যার দিক থেকে স্পষ্ট যে, এবারও অধিকাংশ হজযাত্রী বেসরকারি এজেন্সির মাধ্যমেই সৌদি আরব গেছেন।
হজযাত্রী পরিবহনের জন্য এখন পর্যন্ত মোট ১৬১টি ফ্লাইট পরিচালনা করা হয়েছে। এর মধ্যে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পরিচালনা করেছে ৮২টি ফ্লাইট, যেখানে পরিবহন করা হয়েছে ৩২ হাজার ৫০৮ জন যাত্রী। সৌদি এয়ারলাইন্সের ৫৭টি ফ্লাইটে গেছেন ২১ হাজার ১৬১ জন এবং ফ্লাইনাস এয়ারলাইন্সের ২২টি ফ্লাইটে সৌদি পৌঁছেছেন আরও ৮ হাজার ৮৫৯ জন হজযাত্রী।
প্রতিবারের মতো এবারও সবচেয়ে বেশি চাপ সামলাতে হয়েছে জাতীয় পতাকাবাহী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে। একই সঙ্গে সৌদি এয়ারলাইন্স ও ফ্লাইনাসও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করেছে।
তবে হজের এই বিশাল আয়োজনের মধ্যেই উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে মৃত্যুর ঘটনা। এখন পর্যন্ত সৌদি আরবে ১৭ জন বাংলাদেশি হজযাত্রী ইন্তেকাল করেছেন। মৃতদের মধ্যে ১২ জন পুরুষ এবং ৫ জন নারী। তাদের মধ্যে মক্কায় মারা গেছেন ১২ জন, আর মদিনায় মৃত্যু হয়েছে ৫ জনের।
প্রতি বছরই হজ মৌসুমে বার্ধক্য, শারীরিক দুর্বলতা, অতিরিক্ত গরম, দীর্ঘ ভ্রমণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের কারণে কিছু হজযাত্রীর মৃত্যু ঘটে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অধিকাংশ হাজিই বয়স্ক হওয়ায় স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়িয়ে চলা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে সৌদি আরবের তীব্র গরম আবহাওয়া এবং দীর্ঘ হাঁটার কারণে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।
এ কারণে এবারও চিকিৎসা সহায়তা জোরদার করা হয়েছে। হজ আইটি হেল্পডেস্কের তথ্যমতে, সৌদি আরবের চিকিৎসা কেন্দ্রগুলো থেকে এখন পর্যন্ত ৩৪ হাজার ৩৭০টি স্বয়ংক্রিয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্র দেওয়া হয়েছে। এছাড়া আইটি হেল্পডেস্ক থেকে ১৭ হাজার ৯৮৮টি সেবা প্রদান করা হয়েছে।
ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার কারণে এবার হজ ব্যবস্থাপনায় কিছুটা গতি এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আগে নানা তথ্য পেতে হজযাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হলেও এখন অনলাইন সেবা ও তথ্য সহায়তার কারণে অনেক কাজ সহজ হয়েছে।
আগামী ২৬ মে অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র হজ। সেই লক্ষ্যে সৌদি আরবে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ৩০টি লিড হজ এজেন্সির মাধ্যমে এবার বাংলাদেশ থেকে হজযাত্রীরা সৌদি আরব যাচ্ছেন। গত ১৮ এপ্রিল শুরু হয় হজ ফ্লাইট পরিচালনা, যা চলবে আগামী ২১ মে পর্যন্ত।
এবার সরকারি কোটায় হজ পালনের সুযোগ পেয়েছেন ৪ হাজার ৫৬৫ জন। অন্যদিকে বেসরকারি কোটায় হজে যাচ্ছেন ৭৩ হাজার ৯৩৫ জন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে বিপুল সংখ্যক মুসল্লি এবার পবিত্র হজ পালনে অংশ নিচ্ছেন।
হজ শেষে প্রথম ফিরতি ফ্লাইট শুরু হবে আগামী ৩০ মে থেকে এবং পুরো ফিরতি কার্যক্রম চলবে ৩০ জুন পর্যন্ত।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে প্রতি বছর হজযাত্রীর সংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় ব্যবস্থাপনা আরও আধুনিক ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রিক হওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে বয়স্ক হাজিদের জন্য বিশেষ চিকিৎসা সহায়তা, আবহাওয়ার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কারণ হজ শুধু ধর্মীয় সফর নয়, এটি শারীরিক ও মানসিকভাবে অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য একটি ইবাদতও।

