রাজধানীজুড়ে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ বা টিসিবির ট্রাকসেলে এখন ভিড় আর বিশৃঙ্খলার চিত্র। সামান্য কম দামে নিত্যপণ্য কিনতে সকাল থেকে লাইনে দাঁড়াচ্ছেন নিম্নআয়ের মানুষ। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা, হুড়োহুড়ি, ধাক্কাধাক্কি আর মারামারির মধ্য দিয়ে অনেকেই শেষ পর্যন্ত পণ্য না পেয়েই ফিরছেন। মাত্র ২৬৫ টাকা সাশ্রয়ের জন্য অনেকের অর্ধেক দিন চলে যাচ্ছে লাইনে দাঁড়িয়ে।
রাজধানীর মিরপুর রোডে শেখ জামাল খেলার মাঠসংলগ্ন টিসিবির ট্রাকসেলের সামনে গতকাল এমনই এক ভোগান্তির চিত্র দেখা গেছে। কেরানীগঞ্জের ঘাটারচর থেকে আসা সুমি বেগম সকাল সাড়ে ১০টায় লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। প্রায় তিন ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তিনি পণ্য পাননি। তাঁর অভিযোগ, লাইনের শৃঙ্খলা ভেঙে হুড়োহুড়ির কারণে অনেকেই একাধিকবার পণ্য নিতে পারলেও তিনি একবারও কিছু কিনতে পারেননি।
তিনি বলেন, সংসারের খরচ সামলাতে স্বামীর আয় যথেষ্ট নয়। তাই কম দামে নিত্যপণ্য কিনতে অনেক দূর থেকে এসেছেন। কিন্তু আসা-যাওয়া আর লাইনে দাঁড়াতেই দিনের বড় অংশ শেষ হয়ে গেছে।
শুধু মিরপুর নয়, রাজধানীর ফার্মগেট, কলেজগেট, আদাবর ও খামারবাড়িসহ বিভিন্ন এলাকায় একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। কোথাও ঠেলাঠেলি, কোথাও তর্ক-বিতর্ক, আবার কোথাও নারীদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। ডিলারদের ভাষ্য, নির্ধারিত লাইনের বাইরে গিয়ে অনেকেই জোর করে আগে পণ্য নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
কোরবানির ঈদ সামনে রেখে গত ১১ মে থেকে সারা দেশে ট্রাকসেল কার্যক্রম শুরু করেছে টিসিবি। আগামী ২০ মে পর্যন্ত চলবে এ কার্যক্রম। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে ভোজ্যতেল, চিনি ও মসুর ডাল বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ৪০০ জনের জন্য পণ্য বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে অনেক স্থানে তার কয়েক গুণ বেশি মানুষ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।
মিরপুরের ট্রাকসেলের ডিলার মো. রহিম জানান, পুরুষদের তুলনায় নারীদের ভিড় বেশি হচ্ছে এবং লাইনে শৃঙ্খলা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাঁর ভাষায়, পণ্য বিক্রি শুরুর পর থেকেই ঠেলাঠেলি বাড়ে, ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেগ পেতে হচ্ছে।
রায়েরবাজার থেকে আসা গৃহিণী রাইশন বেগম একবার পণ্য নেওয়ার পর আবার দ্বিতীয়বার লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তাঁর দাবি, প্রথমবার পরিবারের এক সদস্যের জন্য নিয়েছেন, এবার নিজের জন্য নিচ্ছেন। তবে এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে লাইনে বিশৃঙ্খলা আরও বাড়ছে বলে অভিযোগ অন্য ক্রেতাদের।
খামারবাড়ি এলাকায় লাইনে দাঁড়ানো হাজেরা বেগম বলেন, স্বামী-সন্তান ছাড়া মেয়েকে নিয়ে কষ্টে সংসার চালাতে হচ্ছে। বাজারের উচ্চ দামের কারণে বাধ্য হয়েই তিনি দূর থেকে টিসিবির পণ্য কিনতে এসেছেন। একই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা আরেক নারী সরস্বতী অভিযোগ করেন, ধাক্কাধাক্কির কারণে তিনি লাইনে টিকতে পারেননি।
বর্তমানে টিসিবির ট্রাকে একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ২ লিটার ভোজ্যতেল, ১ কেজি চিনি ও ২ কেজি মসুর ডাল কিনতে পারছেন। এসব পণ্যের মোট দাম পড়ছে ৪৮০ টাকা। ব্যাগ নিলে আরও ১০ টাকা বাড়ছে। বাজারদর অনুযায়ী একই পণ্য কিনতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৭৪৫ টাকা। অর্থাৎ একজন ক্রেতা সর্বোচ্চ ২৬৫ টাকা সাশ্রয় করতে পারছেন।
তবে এই সাশ্রয়ের জন্য সকাল থেকে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে মানুষকে। অনেকেই সকাল আটটা বা নয়টা থেকেই এসে অপেক্ষা করছেন, যদিও বিক্রি শুরু হয় বেলা ১১টার দিকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকার পরও সবাই পণ্য পাচ্ছেন না।
বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণেই টিসিবির ট্রাকসেলে এমন চাপ তৈরি হয়েছে। তারা বলছেন, শুধু অস্থায়ী ট্রাকসেল নয়, দীর্ঘমেয়াদে বাজার নিয়ন্ত্রণ ও নিম্নআয়ের মানুষের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

