বিদেশি ঋণে বাস্তবায়িত একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহার করে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় বিলাসবহুল স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা থেকে রংপুর পর্যন্ত মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার লক্ষ্যে নেওয়া প্রকল্পের বড় অংশের অর্থ এখন গবেষণা ও প্রশাসনিক ভবনের নামে অতিরিক্ত ব্যয়ে ব্যবহৃত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এতে প্রকল্প ব্যয় যেমন বেড়েছে, তেমনি পরিবেশ ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল দেশের উত্তরাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতে যুক্ত করা হয় বিভিন্ন অবকাঠামো ও স্থাপনা, যেগুলোর অনেকগুলোই বিলাসবহুল মানের। মাল্টিপারপাস হল, প্রশিক্ষণ কক্ষ, সম্মেলন কক্ষ, আধুনিক লাউঞ্জ, উচ্চমানের আবাসন কক্ষ, সুইমিংপুল, জিমনেসিয়াম এবং ইনডোর গেমস সুবিধাসহ নানা উপাদান যুক্ত হয়েছে এই নির্মাণে। এসবের কারণে প্রকল্পের ব্যয় কয়েক দফা বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় উনিশ হাজার কোটি টাকার বেশি।
শুরুর দিকে প্রকল্পটির জন্য বরাদ্দ ছিল প্রায় বারো হাজার কোটি টাকা। পরবর্তীতে বিভিন্ন সংশোধনের মাধ্যমে তা ধারাবাহিকভাবে বাড়ানো হয়। এক পর্যায়ে ব্যয় বৃদ্ধি প্রায় অস্বাভাবিক পর্যায়ে পৌঁছে যায় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি। বিশেষ করে কিছু কাজ কমিয়ে নতুন উচ্চমূল্যের কাজ যুক্ত করার মাধ্যমে প্রকল্পের মোট ব্যয় বাড়ানো হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
মিরপুরের পাইকপাড়া এলাকায় সড়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে নতুন ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। এখানে আগে থেকেই থাকা স্থাপনা ভেঙে বড় আকারের আধুনিক ভবন নির্মাণ চলছে। পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় থাকা বহু গাছ কাটা হয়েছে এবং কয়েকটি পুকুর ভরাট করা হয়েছে বলেও জানা গেছে। স্থানীয় পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে এলাকার সবুজ ও জলাভূমির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
নতুন নির্মাণাধীন ভবনগুলোতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও প্রশাসনিক কাজের জন্য অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা রাখা হচ্ছে, যা পূর্ববর্তী অবকাঠামোতে ইতোমধ্যে বিদ্যমান ছিল। ফলে একই ধরনের সুবিধা পুনরায় তৈরি করাকে অনেকে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবে দেখছেন। এছাড়া ভবিষ্যতের প্রয়োজন দেখিয়ে অতিরিক্ত তলা যুক্ত করা ও নকশা পরিবর্তনের মাধ্যমে খরচ আরও বাড়ানো হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধির ক্ষেত্রে দরপত্র প্রক্রিয়ার পর বিভিন্ন আইটেম পরিবর্তনের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্রে কম দামে প্রস্তাব দিয়ে কাজ পাওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে সস্তা উপকরণ বাদ দিয়ে উচ্চমূল্যের উপকরণ যুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি কিছু কাজ কমিয়ে নতুন কাজ যুক্ত করার মাধ্যমে চুক্তির মূল কাঠামো পরিবর্তন করা হয়েছে। এতে মোট ব্যয় প্রায় অর্ধেকের কাছাকাছি বৃদ্ধি পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ব্যয় বৃদ্ধি উন্নয়ন প্রকল্পের স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে চলে গেছে। তাদের মতে, নকশা পরিবর্তন, অতিরিক্ত সুবিধা সংযোজন এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্বলতার কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা আরও মনে করেন, এ ধরনের প্রকল্পে বহু স্তরের অনুমোদন থাকলেও কার্যকর তদারকি না থাকায় অনিয়মের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রকল্পের অধীনে শুধু ভবন নয়, বিপুল সংখ্যক যানবাহন, সরঞ্জাম এবং ল্যাবরেটরি যন্ত্রপাতিও কেনা হয়েছে। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এর একটি বড় অংশ যথাযথভাবে ব্যবহার হচ্ছে না। কিছু যন্ত্রপাতি আগেই বিদ্যমান থাকলেও সেগুলো অচল অবস্থায় পড়ে আছে বলে জানা গেছে।
এদিকে পরিবেশগত অনুমোদন ও নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত ছাড়পত্র ছাড়াই ভবন নির্মাণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এতে স্থানীয় পরিবেশ ও নগর ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, ঢাকার সবুজ এলাকা ইতিমধ্যেই ব্যাপকভাবে কমে গেছে, এমন পরিস্থিতিতে এ ধরনের নির্মাণ আরও চাপ সৃষ্টি করবে।
প্রকল্প এলাকায় আগে থাকা কিছু পুরোনো স্থাপনা ভেঙে ফেলা হয়েছে, যেগুলোর স্থাপত্যগত গুরুত্ব ছিল বলে কেউ কেউ মনে করেন। নতুন ভবনের নকশা আধুনিক হলেও এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে প্রকল্প পরিচালনা পর্যায়ের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা পরিবর্তিত হয়েছে। সেই অনুযায়ী নতুন অবকাঠামো যুক্ত করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতের জন্য উন্নত গবেষণা ও প্রশিক্ষণ সুবিধা তৈরির লক্ষ্যেই এসব পরিবর্তন আনা হয়েছে।
তবে অর্থনীতিবিদ ও প্রকৌশল বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, উন্নয়ন প্রকল্পে বারবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং নকশা পরিবর্তন দেশের ওপর অতিরিক্ত ঋণের চাপ তৈরি করছে। তাদের মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া বড় প্রকল্পে এমন ব্যয়বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। সব মিলিয়ে এই প্রকল্প ঘিরে ব্যয়, পরিকল্পনা, পরিবেশ এবং স্বচ্ছতা—সব ক্ষেত্রেই একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের দাবি, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া প্রকৃত চিত্র পরিষ্কার হওয়া কঠিন।

