আজ ১৮ মে আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য হলো ‘বিভক্ত বিশ্বের সেতুবন্ধে জাদুঘর’। এ দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ধারণে সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর। তবে দিবসটির প্রাক্কালে এই জাদুঘরকে ঘিরে ইতিহাস উপস্থাপন নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।
দৈনিক খবরের কাগজের প্রতিবেদনে বলা হয়, ইতিহাসকে ভুলভাবে উপস্থাপন, মুক্তিযুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ অংশ সরিয়ে ফেলা এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উপস্থিতি কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। দর্শনার্থীদের কেউ কেউও এমন অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। তবে জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, কোনো নিদর্শন নষ্ট করা হয়নি। বরং ৫২, ৭১ এবং ২৪ সালের ইতিহাসকে নতুনভাবে উপস্থাপনের কাজ চলছে।
জাদুঘরের ইতিহাস ও বর্তমান চিত্র:
রাজধানীর শাহবাগে অবস্থিত বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর শুধু প্রদর্শনশালা নয়। এটি রাষ্ট্রের ইতিহাস, রাজনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। ১৯১৩ সালে ‘ঢাকা জাদুঘর’ নামে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ জাদুঘর। এখানে নিবন্ধিত নিদর্শন রয়েছে ৯৩ হাজার ২৪৬টি। তবে চারতলা ভবনের ৪৬টি গ্যালারিতে প্রদর্শিত হচ্ছে মাত্র ৪ হাজার ১৭৮টি নিদর্শন অর্থাৎ মোট সংগ্রহের প্রায় ৫ শতাংশই প্রদর্শিত হচ্ছে। বাকি নিদর্শনগুলো সংরক্ষণাগারে রাখা আছে।
গতকাল ১৭ মে রবিবার জাদুঘর পরিদর্শন করেন কয়েকজন দর্শনার্থী। তারা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের উপস্থাপনায় সন্তোষ প্রকাশ করলেও কিছু বিষয়ে প্রশ্ন তোলেন। মুক্তিযুদ্ধ কর্নার ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ঘিরে উপস্থাপনা আগের মতো নেই বলে মন্তব্য করেন অনেকে।
যাত্রাবাড়ী থেকে আসা রায়হান কবীর বলেন, তিনি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর আলাদা কর্নার খুঁজে পাননি। তার ভাষায়, স্বাধীনতার ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর বড় ভূমিকা থাকলেও গ্যালারিতে সেই উপস্থিতি তিনি পাননি। তিনি আরও বলেন, ৭ মার্চের ভাষণ, ১৯৬৬ ও ১৯৬৯ সালের আন্দোলনের দৃশ্যমান উপস্থাপনা অনুপস্থিত। মুক্তিযুদ্ধ কর্নারেও গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ কম বলে তার মনে হয়েছে। লাইব্রেরিতেও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বই কম দেখা গেছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। মিরপুরের দর্শনার্থী শাহনাজ পারভিন মিলা এবং নওগাঁ থেকে আসা খাজামাত উদ্দিনও একই ধরনের পর্যবেক্ষণের কথা জানান।
জাদুঘর কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা:
এই প্রশ্নগুলোর জবাবে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের কিপার ও পাবলিক এডুকেশন বিভাগের প্রধান আসমা ফেরদৌসী বলেন, বঙ্গবন্ধু কর্নার সরানো হয়েছে এটি সত্য। তবে কোনো নিদর্শন ধ্বংস করা হয়নি। তিনি জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় কিছু নিদর্শন ও প্রতিকৃতি সাময়িকভাবে সরিয়ে নিরাপদে রাখা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেকোনো ঐতিহাসিক উপকরণ আবার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে বলে সেগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে।
জাতীয় জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব বলেন, ইতিহাসকে একপক্ষীয়ভাবে নয়, ধারাবাহিক ও গবেষণাভিত্তিকভাবে উপস্থাপন করা হবে। তিনি জানান, ৫২, ৭১ এবং ২৪ সালের ইতিহাস একসঙ্গে গুরুত্ব পাবে। পাশাপাশি ১৯৭১ পরবর্তী সময়ের ঘটনাও উপস্থাপন করা হবে। ইতিহাসের কোনো অংশই বাদ দেওয়া হবে না।
মহাপরিচালক আরও জানান, ১৭ সদস্যের পরিচালনা বোর্ডের অধীনে একটি বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়েছে। এতে গবেষক, তাত্ত্বিক ও ইতিহাসবিদরা কাজ করবেন। এই কমিটি ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ এবং সাম্প্রতিক আন্দোলনসহ বাংলাদেশের সামগ্রিক ইতিহাস নতুনভাবে উপস্থাপনের পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, শুধু স্মারক নয়, ইতিহাস বলার ধরনও গুরুত্বপূর্ণ। তাই ভিডিও, অডিও এবং ডিজিটাল উপস্থাপনার মাধ্যমে তরুণদের কাছে ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
জাতীয় জাদুঘরকে শিশু ও প্রযুক্তিবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতি সপ্তাহে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ দিন, নির্দেশিত পরিদর্শন এবং ডিজিটাল উপস্থাপনার ব্যবস্থা থাকবে। এতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষকদের সঙ্গে জাদুঘর পরিদর্শন করবে এবং আলাদা গাইডেড ট্যুরের সুবিধা পাবে।
গত পাঁচ বছরে প্রায় পাঁচ লাখ শিক্ষার্থী বিনামূল্যে জাদুঘর পরিদর্শন করেছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে টিকিট কেটে দর্শনার্থী এসেছে ৩১ হাজার ৪১১ জন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে দর্শনার্থী কিছুটা কমেছে বলে কর্মচারীরা জানান। একজন কর্মচারী নাম প্রকাশ না করে বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর থেকে দর্শক সংখ্যা কমেছে। আগে তুলনামূলকভাবে বেশি মানুষ আসত। জাতীয় জাদুঘরের অন্যতম বড় সংকট জায়গার অভাব। বিপুলসংখ্যক নিদর্শনের মধ্যে খুব অল্প অংশই প্রদর্শন করা যায়।
মহাপরিচালক জানান, বিদ্যমান ভবনের সংস্কারের পাশাপাশি ১০ তলাবিশিষ্ট নতুন সংযোজন ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। সেখানে নতুন গ্যালারি ও বিশেষ প্রদর্শনীর ব্যবস্থা থাকবে।
জুলাই আন্দোলনের স্মৃতি সংরক্ষণে পৃথক ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’ উদ্বোধনের প্রস্তুতিও চলছে। মহাপরিচালক জানান, আগামী ৫ আগস্টের মধ্যে এটি উদ্বোধনের প্রস্তুতি রয়েছে। জাতীয় জাদুঘরেও একটি জুলাই কর্নার রাখা হবে।
দিবসটি উপলক্ষে জাতীয় জাদুঘরে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচি রয়েছে। সকাল ১০টায় বর্ণাঢ্য র্যালি, বিশেষ প্রদর্শনীর উদ্বোধন, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী এমপির। সভাপতিত্ব করবেন জাদুঘরের মহাপরিচালক তানজিম ওয়াহাব। এতে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং জাদুঘর পর্ষদের প্রতিনিধিরাও অংশ নেবেন।

