যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি)-তে বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে সদস্য পদে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আনোয়ার কাদিরের পদায়ন ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, নজিরবিহীন তদবিরের মাধ্যমে তাকে এই গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো হয়েছে এবং একাধিক প্রশাসনিক নিয়মও উপেক্ষা করা হয়েছে।
সূত্র বলছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অতিরিক্ত মহাপরিচালক, প্রধান প্রকৌশলী ও অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীসহ মোট ২৩ জন সিনিয়র কর্মকর্তাকে পাশ কাটিয়ে এই পদায়ন করা হয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৩ জুন যৌথ নদী কমিশনের সদস্য পদে নিয়োগসংক্রান্ত গেজেট প্রকাশিত হয়। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রকৌশল ডিগ্রি ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং সরকারের যুগ্ম সচিব, প্রধান প্রকৌশলী বা অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে কর্মরত কর্মকর্তাই এই পদে যোগ্য হবেন। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই বিধান উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শেষ সময়ে আনোয়ার কাদিরকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এদিকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া আবুল হোসেনকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন সৎ ও মেধাবী প্রকৌশলী হিসেবে পরিচিত বলে সহকর্মীরা উল্লেখ করেছেন। তিনি সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের প্লাইমাউথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার সাউথ অস্ট্রেলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তঃনদী পানি ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
কর্মকর্তাদের অভিযোগ, আনোয়ার কাদিরকে জেআরসিতে নিয়োগ দেওয়ার ফলে সংস্থার সিনিয়র একাধিক কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে অবমূল্যায়ন করা হয়েছে। একজন কর্মকর্তা জানান, আনোয়ার কাদির আগে জেআরসিতে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং পরিচালক আবু সাঈদের অধীনে কাজ করতেন। তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) মূল্যায়নের ভিত্তিতে তিনি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পান। পরে তাকেই আবু সাঈদের সিনিয়র হিসেবে জেআরসিতে পদায়ন করা হয়, যা নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা মনে করছেন, জেআরসির সামনে বর্তমানে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ চলতি বছর শেষ হতে যাচ্ছে। অন্যদিকে তিস্তা ও ফেনী চুক্তির খসড়া ২০১১ সালে এবং কুশিয়ারা নদীর সমঝোতা স্মারক ২০২২ সালে স্বাক্ষরিত হয়। কুশিয়ারা প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পাবে এবং শুষ্ক মৌসুমে ১৫৩ কিউসেক পানি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তাদের মতে, এমন সংকটপূর্ণ সময়ে জেআরসিতে অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রতিনিধি প্রয়োজন। কারণ পানি বণ্টনের ন্যায্য হিস্যা আদায়ে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক দক্ষতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক দৈনিক যুগান্তরকে বলেন, নিয়ম অনুযায়ী দ্বিতীয় ও তৃতীয় গ্রেডের সংস্থাপ্রধান নিয়োগে প্রধান উপদেষ্টা বা প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন প্রয়োজন হয়। তবে বিগত সরকারের সময়ে এই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে আনোয়ার কাদির অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি কোনো তদবিরের মাধ্যমে এখানে আসেননি। তার ভাষায়, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বদলির পরই তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি আরও জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডে যেমন দায়িত্ব পালন করেছেন, জেআরসিতেও একইভাবে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন।

