পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দেশের বৃহত্তম পাইকারি মসলা বাজার চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে গরম মসলার বেচাকেনা কিছুটা জমে উঠেছে। এলাচ, জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, জায়ফল, জৈত্রিক ও শুকনা মরিচে বাজারে এখন সরবরাহ রয়েছে পর্যাপ্ত। এর প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজার এবং অলিগলির মসলা ভাঙানোর কলঘরগুলোতেও, যেখানে ব্যস্ততা কিছুটা বেড়েছে।
তবে এই ঈদ মৌসুমের ভেতরেও ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে পণ্য থাকলেও ক্রেতার উপস্থিতি আগের তুলনায় অনেক কম। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা পাইকারি মসলা কিনতে আসতেন। কিন্তু এবার সেই উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে কম। ফলে ঈদের সময় হলেও বাজারে আগের মতো প্রাণচাঞ্চল্য নেই।
একই সঙ্গে মরিচের দাম কিছুটা বাড়লেও পাইকারি বাজারে ক্রেতা সংকট, দামের ওঠানামা, চোরাচালান বৃদ্ধি এবং অত্যধিক আমদানিনির্ভরতার কারণে ব্যবসায়ীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। খাতুনগঞ্জের ব্যবসায়ী জুলফিকার আলী হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “এই বছরের মতো মন্দা আগে দেখিনি। ঈদের সময়েও বিক্রি কম। খরচ বাড়ছে, কিন্তু ক্রেতা নেই। প্রতিদিন লোকসান গুনতে হচ্ছে।”
চট্টগ্রাম বন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে ১০ মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে বিভিন্ন মসলা আমদানি হয়েছে। এর মধ্যে এলাচ ১ হাজার ১৫০ টন, দারুচিনি ১৩ হাজার ২৯৬ টন, লবঙ্গ ১ হাজার ৩৫০ টন, জিরা ৩ হাজার ১১৫ টন এবং গোলমরিচ ১ হাজার ৯৫৯ টন এসেছে। একই সময়ে আদা এসেছে ৪৫ হাজার ৫৩৮ টন এবং রসুন ৫৩ হাজার ১০১ টন। তবে আগের অর্থবছরের একই সময়ে এলাচ আমদানি হয়েছিল ১ হাজার ৮৪৬ টন এবং দারুচিনি ১৫ হাজার ৭৩৯ টন, যা চলতি বছরের তুলনায় বেশি। আমদানিকারকদের দাবি, সরকারি হিসাবে কিছু মসলার আমদানি কম দেখালেও সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ মসলা দেশে ঢুকছে। এতে বৈধ ব্যবসায়ীরা প্রতিযোগিতায় টিকতে হিমশিম খাচ্ছেন।
খাতুনগঞ্জের মসলা আমদানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে প্রায় সব ধরনের মসলার দাম কমেছে। পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও বিক্রি প্রত্যাশিত নয়। এক সপ্তাহ আগে ভারতীয় জিরা কেজিতে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা নেমে এসেছে ৫৩০ টাকায়। একই সময়ে দারুচিনি কেজিপ্রতি ২০ টাকা, লবঙ্গ ৪০ টাকা, এলাচ ১০০ থেকে ১৫০ টাকা, মিষ্টি জিরা ৫ টাকা এবং জায়ফল ৩০ টাকা কমেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে দেদার আমদানি, অন্যদিকে চোরাচালানের কারণে বাজারে কোনো ঘাটতি নেই। বরং সরবরাহ বেশি থাকায় দামেও চাপ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ পাইকারি গরম মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সহ-সভাপতি অমর কান্তি দাশ বলেন, “আমরা ব্যাংকে এলসি খুলে, ডলার প্রিমিয়াম দিয়ে এবং শুল্ক-কর পরিশোধ করে পণ্য আমদানি করি। অথচ চোরাই পথে আসা মসলা অনেক কম দামে বাজারে বিক্রি হচ্ছে। এতে বৈধ ব্যবসায়ীরা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না।” তার মতে, বাজারে সরবরাহ থাকলেও ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ নেই, ফলে বৈধ ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কোরবানির ঈদকে ঘিরে সাধারণত মসলা পণ্যের চাহিদা ও দাম উভয়ই বাড়ে। তবে এবার তার বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে। মেসার্স হাজী জসিম ট্রেডার্সের ম্যানেজার আশিকুর রহমান জিহান বলেন, “প্রতি বছর ঈদের আগে চাহিদা বাড়ে। কিন্তু এবার ক্রেতা কম, বিক্রিও আশানুরূপ নয়। বাজারে পর্যাপ্ত মজুত থাকলেও দামের ওপর চাপ পড়েছে এবং বেশিরভাগ পণ্যের দাম কমছে।”
বর্তমানে পাইকারি বাজারে ছোট এলাচ ৩ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার ৯০০ টাকা, বড় এলাচ ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ৪০০ টাকা, লবঙ্গ ১ হাজার ২৬০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা, চিকন জিরা ৫২৫ থেকে ৫৩৫ টাকা এবং কালো গোলমরিচ কেজিপ্রতি ১ হাজার ১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
খুচরা বাজারে দাম আরও বৈচিত্র্যপূর্ণ। বকশির হাটের পিতাম্বর শাহ’র দোকানে ভারতের এলাচ ৪ হাজার ৮০০ টাকা, আমেরিকান এলাচ ৪ হাজার ২০০ টাকা, শ্রীলঙ্কার দারুচিনি ১ হাজার ৫০ টাকা এবং ভিয়েতনামের দারুচিনি ৪৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লবঙ্গ ১ হাজার ৪৮০ টাকা এবং ভারতের চিকন জিরা ৬২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
মসলার বাজারে দাম কমলেও মরিচের বাজারে উল্টো প্রবণতা দেখা গেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, দুই–তিন মাস আগে ভারতীয় শুকনা মরিচ ৩৬০ টাকায় বিক্রি হলেও এখন তা বেড়ে ৪২৫ টাকায় উঠেছে। হাটহাজারীর স্থানীয় মরিচও ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, একদিকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে, অন্যদিকে পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনে প্যাকেটজাত মসলার ব্যবহার বেড়েছে। এর পাশাপাশি সীমান্ত চোরাচালান ও বাজার নজরদারির ঘাটতি বৈধ ব্যবসাকে আরও সংকটে ফেলছে। মেসার্স ইসহাক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী সেকান্দার হোসেন বলেন, “বাজার স্থিতিশীল রাখতে হলে চোরাচালান বন্ধ, বৈধ আমদানিতে সহায়তা এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো জরুরি।”
মসলায় ভেজাল নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। সম্প্রতি ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযানে জিরার সঙ্গে ক্যারাওয়ে বীজ মেশানোর ঘটনা ধরা পড়ে। আগে নিম্নমানের মসলা ও ভুষি মিশিয়ে গুঁড়া মসলা বিক্রির অভিযোগও পাওয়া গেছে। এ কারণে অনেক পরিবার এখন গোটা মসলা কিনে বাসায় শুকিয়ে নিজে গুঁড়া করার দিকে ঝুঁকছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের উদ্ভিদ সংগনিরোধ কেন্দ্রের উপপরিচালক ড. মোহাম্মদ শাহ আলম বলেন, “দেশে পর্যাপ্ত মসলা মজুত আছে। আমদানি ও অনুমোদন প্রক্রিয়া মিলিয়ে বাজার পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল অবস্থায় রয়েছে।”

