দরিদ্র ও প্রান্তিক শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করতে চালু হওয়া স্কুল ফিডিং কর্মসূচি এখন নানা প্রশ্নের মুখে। যে উদ্যোগ শিশুদের অপুষ্টি কমানো, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়ানো এবং শিক্ষায় মনোযোগ ধরে রাখার কথা ছিল, সেই কর্মসূচিতেই উঠছে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ, অনিয়ম এবং অর্থ লুটপাটের অভিযোগ। দেশের বিভিন্ন এলাকায় পচা ডিম, নিম্নমানের রুটি ও নির্ধারিত পুষ্টিমান ছাড়া খাবার বিতরণের অভিযোগ সামনে আসায় উদ্বেগ বাড়ছে অভিভাবক ও সচেতন মহলে।
সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অনেক বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য বরাদ্দ খাবারের মান অত্যন্ত খারাপ। কোথাও দেওয়া হচ্ছে শক্ত ও বাসি রুটি, কোথাও পচা ডিম, আবার কোথাও নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ কাগজে–কলমে প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি টাকার ব্যয় দেখানো হচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, শিশুদের পুষ্টির জন্য বরাদ্দ অর্থ আসলে কতটা শিশুদের জন্য ব্যয় হচ্ছে এবং কতটা হারিয়ে যাচ্ছে দুর্নীতির চক্রে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, এই খাবারের ওপর নির্ভরশীল বহু শিশু হয়তো দিনের সবচেয়ে নিশ্চিত পুষ্টিকর খাবার হিসেবে স্কুলের খাদ্যকেই ভরসা করে। সেই জায়গাতেই যদি অনিয়ম ঢুকে পড়ে, তাহলে এটি শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং সামাজিক ও নৈতিক সংকটও বটে। কারণ, একটি শিশুর মৌলিক খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজ—উভয়ের দায়িত্ব।
এই কর্মসূচির বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠলেও জবাবদিহির জায়গা এখনও দুর্বল। খাদ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় তদারকি কমিটি এবং প্রশাসনের দায়িত্বশীল অংশের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের খাবার সরবরাহ হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না। ফলে অনিয়ম যেন ধীরে ধীরে একটি স্বাভাবিক চিত্রে পরিণত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের পুষ্টি কর্মসূচি শুধু একটি প্রকল্প নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়ন পরিকল্পনা। শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে সুষম খাদ্যের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অপুষ্ট শিশু শুধু স্বাস্থ্যঝুঁকিতেই পড়ে না, তার শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ ও ভবিষ্যৎ উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে স্কুল ফিডিংয়ের মতো উদ্যোগ ব্যর্থ হলে তার প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো সমাজের ওপর পড়ে।
উন্নত দেশগুলোর অভিজ্ঞতা এ ক্ষেত্রে ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরে। উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে স্কুল খাবারকে শিশুদের মৌলিক অধিকার হিসেবে দেখা হয়। সেখানে খাবারের মান নির্ধারণে পুষ্টিবিদ, শিক্ষা প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষ একসঙ্গে কাজ করে। শুধু পেট ভরানো নয়, শিশুদের স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলাও সেই ব্যবস্থার অংশ। একই সঙ্গে কঠোর তদারকি ও জবাবদিহির কারণে অনিয়মের সুযোগও সীমিত।
বাংলাদেশেও সরকার বিপুল অর্থ বরাদ্দ দিয়ে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি চালু রেখেছে। কিন্তু বাস্তবায়নের স্তরে দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা ঢুকে পড়লে সেই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা বড় বাজেটের ঘোষণা দিয়ে টেকসই হয় না; উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই সুবিধা প্রকৃত উপকারভোগীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হলো—শিশুরা ছোটবেলা থেকেই এসব অনিয়ম চোখের সামনে দেখছে। তারা দেখছে, তাদের খাবার নিয়েও কারসাজি হতে পারে। এতে শিশুদের মনে রাষ্ট্র, প্রতিষ্ঠান ও দায়িত্ববোধ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এটি সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক কাঠামোকেও দুর্বল করে দিতে পারে।
এই বাস্তবতায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কার্যকর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। শুধু প্রকল্প চালু করলেই হবে না, মাঠপর্যায়ে খাবারের মান, সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থ ব্যবহারের ওপর কঠোর তদারকি প্রয়োজন। অন্যথায় শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করার নামে চলতে থাকা এই কর্মসূচি ভবিষ্যতে আরও বড় অনাস্থা ও ক্ষোভের কারণ হয়ে উঠতে পারে।

