দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে আবারও বড় বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে গ্রামীণফোন ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন। দীর্ঘদিন ধরে চলা আর্থিক অনিয়ম ও রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগের তদন্ত শেষ না হতেই নতুন করে ১০ বছরের অডিট শুরু করতে যাচ্ছে বিটিআরসি। তবে অডিট শুরুর আগেই এর আইনগত ভিত্তি, পরিধি ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে পুরো প্রক্রিয়া স্থগিতের আবেদন করেছে দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন।
বিটিআরসি বলছে, এটি নিয়মিত নিয়ন্ত্রক অডিটের অংশ। কিন্তু গ্রামীণফোনের দাবি, নতুন অডিটের আওতায় এমন অনেক বিষয় আনা হয়েছে, যা বিটিআরসির এখতিয়ারের বাইরে পড়ে। ফলে দুই পক্ষের অবস্থান এখন সরাসরি মুখোমুখি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের কার্যক্রম পর্যালোচনায় ‘অপারেটরস প্রসিডিউর অ্যান্ড সিস্টেমস অডিট’ চালাতে চায় বিটিআরসি। এ কাজের জন্য একটি চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস প্রতিষ্ঠানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। প্রায় ৩ কোটি ১৭ লাখ টাকার চুক্তিতে পরিচালিত এই অডিটে অপারেটরটির আর্থিক, কারিগরি ও নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম খতিয়ে দেখা হবে।
তবে অডিট শুরুর আগেই বিটিআরসি চেয়ারম্যানের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে গ্রামীণফোন পুরো কার্যক্রম স্থগিত রাখার অনুরোধ জানিয়েছে। একই সঙ্গে তারা বিটিআরসির সঙ্গে ‘সুগঠিত আলোচনা’র আহ্বান জানিয়েছে। অপারেটরটির দাবি, আগের অডিটে পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল এবং নতুন অডিটেও সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা রয়েছে।
মূল বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে বিটিআরসির এখতিয়ার। গ্রামীণফোন বলছে, কর ফাঁকি, বৈদেশিক মুদ্রা স্থানান্তর, শেয়ার লেনদেন, শ্রমনীতি, ভ্যাট-ট্যাক্স কিংবা বিদেশি ঋণের মতো বিষয় বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বিডা বা বিএসইসির আওতাধীন। তাই এসব বিষয়ে বিটিআরসির অডিট আইনগত জটিলতা তৈরি করতে পারে। পাশাপাশি ১০ বছরের তথ্য একসঙ্গে যাচাইকে অবাস্তব বলেও দাবি করেছে তারা।
অন্যদিকে বিটিআরসির অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত। নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, টেলিযোগাযোগ আইন অনুযায়ী লাইসেন্সধারী যেকোনো অপারেটরের আর্থিক, নিয়ন্ত্রক ও পরিপালন অডিট পরিচালনার পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনের রয়েছে। গ্রামীণফোন ইচ্ছাকৃতভাবে অডিট বিলম্বিত করতে নানা প্রশ্ন তুলছে বলেও অভিযোগ তাদের।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল মো. এমদাদ উল বারী জানিয়েছেন, বর্তমান অডিট ১৯৯৭-২০১৪ সময়ের আগের অডিট থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে বিচারাধীন বিষয় দেখিয়ে নতুন অডিট ঠেকানোর সুযোগ নেই। তিনি আরও বলেন, অডিটের পরিধি ও কার্যপদ্ধতি আগেই গ্রামীণফোনকে জানানো হয়েছে এবং কমিশন আশা করে অপারেটরটি পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
এই বিরোধের পেছনে রয়েছে বহু বছরের পুরোনো আর্থিক দ্বন্দ্ব। বিটিআরসির আগের ইনফরমেশন সিস্টেম অডিটে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি, আর্থিক অসংগতি ও লাইসেন্স শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। সেই অডিটের ভিত্তিতে বিটিআরসি ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা দাবি করে। এর মধ্যে বিটিআরসির দাবি ছিল প্রায় ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি টাকা এবং এনবিআরের অংশ ছিল ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।
অডিট প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক কলের আয় কম দেখানো, রাজস্ব ভাগ কম দেওয়া, কল ডাটায় গরমিল, তরঙ্গ ফি নির্ধারণে অসংগতি এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে পূর্ণাঙ্গ তথ্য না দেওয়ার মতো অভিযোগ উঠে আসে। এছাড়া অনুমোদনহীন টাওয়ার স্থাপন, অনিবন্ধিত সিম ব্যবহারের তথ্য গোপন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি সহায়তায় ঘাটতির অভিযোগও ছিল।
তবে শুরু থেকেই গ্রামীণফোন ওই অডিটকে ‘ত্রুটিপূর্ণ’ দাবি করে আসছে। তাদের বক্তব্য, দাবিকৃত অর্থের বড় অংশই সুদ ও ভুল হিসাবের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করা হয়েছে। বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এবং এখনো নিষ্পত্তি হয়নি। জানা গেছে, আদালতের বাইরে সমঝোতার পথও খুঁজছে অপারেটরটি।
নতুন অডিটে আগের মতো বড় ধরনের আর্থিক গরমিল বেরিয়ে আসতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকেই গ্রামীণফোন অডিট ঠেকাতে চাইছে বলে মনে করছেন বিটিআরসির একাধিক কর্মকর্তা। তাদের মতে, অন্য অপারেটররা যেখানে অডিটে সহযোগিতা করছে, সেখানে গ্রামীণফোনের প্রকাশ্য আপত্তি অস্বাভাবিক।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের টেলিযোগাযোগ খাত এখন শুধু প্রযুক্তি বা ব্যবসার বিষয় নয়, এটি বড় অর্থনৈতিক ও নিয়ন্ত্রক প্রশ্নেও পরিণত হয়েছে। একদিকে বিদেশি বিনিয়োগ ও বাজার স্থিতিশীলতার বিষয় রয়েছে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আদায় ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও জড়িত। ফলে গ্রামীণফোন-বিটিআরসি বিরোধের ফলাফল পুরো টেলিকম খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হয়ে উঠতে পারে।

