চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক হৃদয়বিদারক ঘটনা আবারও আলোচনায় এনেছে দেশের শিশু চিকিৎসা ব্যবস্থার বাস্তব চিত্র। মাত্র ৯ মাস বয়সী এক শিশুর মৃত্যু ঘিরে তৈরি হয়েছে শোক, ক্ষোভ এবং নানা প্রশ্ন। পরিবারের দাবি, সময়মতো প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তা না পাওয়ায় তাদের সন্তানকে হারাতে হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, শিশুটি জটিল রোগে আক্রান্ত ছিল এবং তার অবস্থা আগেই সংকটাপন্ন ছিল।
ঘটনাটি ঘটে সোমবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে। শিশুটিকে কয়েক দিন আগে ভর্তি করা হয়েছিল হামের জটিলতায়। চিকিৎসকেরা জানান, শিশুটির শরীরে হাম শনাক্ত হওয়ার পর তার অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরবর্তীতে মস্তিষ্কে প্রদাহজনিত জটিলতা তৈরি হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও গুরুতর করে তোলে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, শিশুটির শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী একটি বিশেষ ধরনের অক্সিজেন সহায়ক যন্ত্রাংশ প্রয়োজন হয়। তারা অভিযোগ করেন, সেই যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করতে গিয়ে সময় নষ্ট হয় এবং এই সময়ের মধ্যেই শিশুটির অবস্থার অবনতি ঘটে। এক পর্যায়ে হাসপাতাল থেকেই তাদের জানানো হয় যে শিশুটি আর বেঁচে নেই।
শিশুটির বাবা দীর্ঘ সময় ধরে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করছিলেন বলে জানা যায়। তিনি বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করে দ্রুত যন্ত্রাংশ আনার চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু তার অভিযোগ, সেই সহায়তা আসার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। সন্তানের মৃত্যুসংবাদ পাওয়ার পর তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং হাসপাতাল প্রাঙ্গণেই অসহায়ভাবে বসে পড়েন।
ঘটনার সময় শিশুটির মা আইসিইউর ভেতরে ছিলেন। সন্তানের মৃত্যুর খবর জানার পর তিনি ভেঙে পড়েন এবং কান্নায় পুরো পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। পরিবারের সদস্যদের আহাজারিতে হাসপাতালের করিডর মুহূর্তেই শোকের দৃশ্যে পরিণত হয়।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিশুটির শরীরে হামের পরবর্তী জটিলতা তৈরি হয়েছিল, যাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় মস্তিষ্ক প্রদাহ। এই অবস্থায় শিশুর উচ্চ জ্বর, খিঁচুনি, অচেতনতা এবং স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তারা আরও জানান, এমন অবস্থায় রোগীর জীবন রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে মোট শয্যার মধ্যে বেশিরভাগই হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীতে ভর্তি ছিল। একই সময়ে সেখানে একাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তোলে। ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে একাধিক শিশুর মৃত্যুর ঘটনা স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর চাপের দিকটি আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।
এদিকে, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সরঞ্জাম নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। জানা গেছে, কিছু যন্ত্রপাতি অনুদানের মাধ্যমে পাওয়া হলেও সেগুলোর সব সময় কার্যকারিতা ঠিক থাকে না। ফলে অনেক সময় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে গিয়ে বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হয়, যা রোগীর পরিবারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শিশু নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের শয্যা ও যন্ত্রপাতির একটি অংশ সরকারি, আর একটি অংশ অনুদাননির্ভর। ফলে রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবহারযোগ্যতা নিয়ে মাঝে মাঝে সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখার আশ্বাস দিয়েছেন।
অন্যদিকে চিকিৎসকদের একটি অংশ মনে করেন, এমন জটিল রোগের ক্ষেত্রে সময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগীর অবস্থা দ্রুত পরিবর্তন হতে পারে, তাই প্রতিটি মুহূর্তই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। তারা আরও বলেন, কিছু ক্ষেত্রে রোগীর পরিবারের অর্থনৈতিক সক্ষমতা ও সরঞ্জাম সংগ্রহের সময় চিকিৎসার গতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই ঘটনার মধ্য দিয়ে আবারও সামনে এসেছে দেশের শিশু স্বাস্থ্যসেবার কাঠামোগত দুর্বলতা, বিশেষ করে সংকটকালীন সময়ে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন। একই সঙ্গে এটি দেখিয়ে দিয়েছে, একটি পরিবারের জন্য চিকিৎসা ব্যবস্থা কতটা নির্ভরযোগ্য বা কতটা চাপের হতে পারে।
শিশুটির মৃত্যু শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং একটি বৃহত্তর বাস্তবতার প্রতিফলন—যেখানে চিকিৎসা, প্রযুক্তি এবং মানবিক সহায়তার সমন্বয় নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্ন রয়ে গেছে।
এই ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করে দেখার কথা জানিয়েছে। তবে একটি পরিবার তাদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি ইতিমধ্যেই ভোগ করে ফেলেছে, যার কোনো বিকল্প নেই।

