কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দুই কর্মকর্তার মধ্যে প্রকাশ্যে সংঘর্ষ ও মারধরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশের কৃষি প্রশাসনে অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (কেআইবি) প্রাঙ্গণে সংঘটিত এ ঘটনায় এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা আহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঘটনার পর তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তাকে বদলি করা হয়েছে। একই সঙ্গে অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগও সামনে এসেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সোমবার রাতে কেআইবি চত্বরে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক বনি আমিন খান এবং একই অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক এ এম মাসুম বিল্লাহর মধ্যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, কথাকাটাকাটির এক পর্যায়ে শারীরিক সংঘর্ষে রূপ নেয় পরিস্থিতি। এতে বনি আমিন খান মুখে ও চোখের নিচে আঘাত পান এবং রক্তপাতের ঘটনা ঘটে। পরে তাঁকে রাজধানীর একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
ঘটনার পরদিন বনি আমিন খান লিখিতভাবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে অভিযোগ জমা দেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেন। তবে অভিযোগ জমা দেওয়ার পর প্রশাসনিক অঙ্গনে নানা ধরনের তৎপরতা শুরু হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
বুধবার কৃষি মন্ত্রণালয় পৃথক প্রজ্ঞাপন জারি করে দুই কর্মকর্তাকেই বর্তমান কর্মস্থল থেকে সরিয়ে দেয়। আদেশ অনুযায়ী, এ এম মাসুম বিল্লাহকে সুনামগঞ্জে অতিরিক্ত উপপরিচালক হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে বনি আমিন খানের আগের বদলির আদেশ বাতিল করে তাঁকে নড়াইলে একই পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। উভয় কর্মকর্তাকে দ্রুত নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্ত নিয়ে কৃষি প্রশাসনের ভেতরে প্রশ্ন উঠেছে। অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, তদন্ত সম্পন্ন হওয়ার আগে অভিযোগকারী ও অভিযুক্ত উভয়কে একসঙ্গে বদলি করা হলে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদঘাটনের প্রক্রিয়া প্রভাবিত হতে পারে। বিশেষ করে আহত কর্মকর্তা চিকিৎসাধীন অবস্থায় থাকলেও তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে কর্মস্থল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়াকে অনেকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখছেন।
ঘটনার বিষয়ে বনি আমিন খান জানিয়েছেন, তিনি একটি নিরপেক্ষ তদন্ত এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা প্রত্যাশা করছেন। তাঁর দাবি, তিনি প্রকাশ্যে হামলার শিকার হয়েছেন এবং ঘটনার সুষ্ঠু বিচার হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে অভিযুক্ত কর্মকর্তা এ এম মাসুম বিল্লাহ ঘটনাকে অনাকাঙ্ক্ষিত বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে ঘটনাটি ঘটেছে এবং পরে উপস্থিত সবার সামনে দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন।
কৃষি সচিব রফিকুল ই মোহামেদ জানিয়েছেন, ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে তদন্ত করা হবে। তাঁর মতে, কী ঘটেছে এবং কার ভূমিকা কী ছিল, তা তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হবে। এজন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রস্তুতি চলছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিমও জানিয়েছেন, অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শারীরিক হামলার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর এবং এ ধরনের ঘটনা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এদিকে একই ঘটনার জেরে বুধবার আরেকটি বিতর্কিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। রাজধানীতে একটি কারিগরি কর্মশালা শেষে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের সঙ্গে কয়েকজন কর্মকর্তার উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার ঘটনার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাতে গিয়ে এক কর্মকর্তা উচ্চস্বরে কথা বলেন এবং মহাপরিচালকের ওপর চাপ প্রয়োগের চেষ্টা করেন। এ সময় আরও কয়েকজন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন।
সূত্রগুলোর দাবি, পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলেও মহাপরিচালক কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে অনুষ্ঠানস্থল ত্যাগ করেন। ঘটনাটি কৃষি প্রশাসনের ভেতরে বিদ্যমান বিভাজন ও অসন্তোষের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
কৃষি খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তাদের মধ্যে প্রকাশ্য সংঘর্ষ এবং পরবর্তীতে প্রশাসনিক টানাপোড়েন শুধু শৃঙ্খলার প্রশ্নই নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গেও জড়িত। তারা বলছেন, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, দায় নির্ধারণ এবং বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বর্তমানে কৃষি প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এই ঘটনা। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন এবং পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের ওপরই নির্ভর করছে পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেবে।

