পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম আবারও বাড়ানোর প্রস্তাব ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে শিল্প, ব্যবসা ও সাধারণ ভোক্তাদের মধ্যে। সরকার ভর্তুকির চাপ কমাতে মূল্য বাড়ানোর কথা বললেও অংশীজনরা বলছেন, এতে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও অসহনীয় হয়ে উঠবে এবং শিল্প খাত বড় সংকটে পড়বে।
বুধবার রাজধানীর ফার্মগেটে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত গণশুনানিতে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড পাইকারি বিদ্যুতের দাম প্রতি ইউনিটে ১ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫০ পয়সা পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব উপস্থাপন করে। বর্তমানে পাইকারি পর্যায়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রি হচ্ছে ৭ টাকা ৪ পয়সায়।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে বলা হয়, ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন, জ্বালানি আমদানির বাড়তি ব্যয় এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় বিদ্যুতের বর্তমান মূল্য কাঠামো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী, এখন প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ বিক্রিতে সরকারের ভর্তুকি দিতে হচ্ছে প্রায় ৫ টাকা ৪৭ পয়সা।
গণশুনানিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের কারিগরি মূল্যায়ন কমিটি জানায়, বিদ্যুতের দাম বড় পরিসরে বাড়ানো হলে ভর্তুকির চাপ অনেকটাই কমে আসবে। তাদের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, মূল্য প্রায় ৭৭ শতাংশ বাড়ানো গেলে ভর্তুকির প্রয়োজন প্রায় থাকবে না।
তবে এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানান ভোক্তা অধিকার সংগঠন, রাজনৈতিক প্রতিনিধি এবং ব্যবসায়ী নেতারা। তাদের অভিযোগ, বারবার দাম বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, অথচ বিদ্যুৎ খাতের ব্যবস্থাপনা ও অপচয় কমানোর বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা বলেন, শুধু ভর্তুকির বোঝা কমানোর যুক্তিতে দাম বাড়ানো হলে জনগণের জীবনযাত্রা আরও কঠিন হয়ে উঠবে। তাদের মতে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো মানুষের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। বিদ্যুতের মতো মৌলিক সেবায় লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতি ও সমাজ—দুই ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
গণশুনানিতে অংশ নেওয়া কয়েকজন বক্তা প্রশ্ন তোলেন, প্রতিবার শুনানি আয়োজনের পরই কেন শেষ পর্যন্ত মূল্যবৃদ্ধির সিদ্ধান্ত আসে। তাদের ভাষ্য, বর্তমান প্রক্রিয়ায় জনগণের মতামত বাস্তবে কতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, সেটি নিয়ে মানুষের মধ্যে সন্দেহ তৈরি হয়েছে।
শিল্প খাতের প্রতিনিধিরাও বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর বিপক্ষে অবস্থান নেন। তৈরি পোশাক ও রফতানিমুখী শিল্প উদ্যোক্তারা বলেন, এমনিতেই বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে বিদ্যুতের ব্যয় বাড়লে উৎপাদন খরচ বাড়বে, রফতানিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে এবং অনেক কারখানা টিকে থাকাই কঠিন হয়ে যেতে পারে।
ব্যবসায়ী নেতারা আরও বলেন, দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। এই অবস্থায় বিদ্যুতের নতুন মূল্যবৃদ্ধি হলে পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহন ও দৈনন্দিন সেবার খরচও বেড়ে যাবে। শেষ পর্যন্ত সেই চাপ বহন করতে হবে সাধারণ মানুষকেই।
অন্যদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বিদ্যুৎ খাতে সরকারের ভর্তুকির পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে। গত অর্থবছরে এই খাতে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে বলে হিসাব করা হচ্ছে। ফলে মোট ভর্তুকির পরিমাণ ৬০ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের চেয়ারম্যান বলেন, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির পরও পুরো ঘাটতি পূরণ হবে না। তবে এতে সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমানো সম্ভব হবে।
গণশুনানি শেষে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান জানান, অংশগ্রহণকারীদের মতামত ও কারিগরি মূল্যায়ন পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে বিদ্যুতের সম্ভাব্য মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে ইতোমধ্যেই জনমনে উদ্বেগ বাড়তে শুরু করেছে।

