বিদেশে ভালো চাকরি আর পরিবারের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন নিয়ে দেশ ছেড়েছিলেন ৩০ বাংলাদেশি যুবক। তাদের মধ্যে ছিলেন গোপালগঞ্জ জেলার তিন তরুণও। কিন্তু রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের জন্য অপেক্ষা করছিল এক ভয়ংকর বাস্তবতা। পরিবারের অভিযোগ, নির্মাণকাজে চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলেও পরে তাদের জোর করে রুশ সেনাবাহিনীর অধীনে নেওয়া হয়েছে এবং যুদ্ধের জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হয়েছে।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর মধ্যে চরম উদ্বেগ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। প্রিয়জনদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে প্রশাসন ও সরকারের কাছে আকুতি জানাচ্ছেন তারা।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন গোপালগঞ্জ সদর উপজেলার ঘোষেরচর উত্তরপাড়া গ্রামের পলাশ শেখ, সুতিয়ারকুল গ্রামের রনি ফকির এবং বলাকৈড় গ্রামের সৌরভ মোল্লা। পরিবারগুলোর দাবি, ঢাকার নিকুঞ্জ এলাকার জাবাল-ই-নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়। মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বেতনে নির্মাণশ্রমিকের চাকরির প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। এজন্য প্রত্যেকের কাছ থেকে নেওয়া হয় প্রায় ৭ লাখ টাকা।
গত ৭ মে গোপালগঞ্জের এই তিনজনসহ মোট ৩০ বাংলাদেশিকে একটি ফ্লাইটে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায় বলে অভিযোগ পরিবারের। তাদের দাবি, যুবকদের মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া হয় এবং পরে জোর করে এক বছরের সামরিক চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করানো হয়।
পলাশ শেখের দাদা বালা শেখ জানান, ছোটবেলায় মা হারানোর পর দাদা-দাদির কাছেই বড় হয়েছে পলাশ। পরিবারের স্বচ্ছলতার আশায় বিদেশে গিয়েছিল সে। এখন তাকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে—এ খবর শুনে পরিবার ভেঙে পড়েছে।
পরিবারের সদস্যদের কাছে পাঠানো বার্তায় পলাশ জানিয়েছেন, তাদের চুল কেটে সামরিক পোশাকের মাপ নেওয়া হয়েছে এবং সামরিক প্রশিক্ষণও দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেছেন, তারা এখন এমন একটি ক্যাম্পে আছেন, যেখান থেকে প্রায়ই গোলাগুলি ও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়।
একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন রনি ফকিরের স্ত্রী তৃষা বেগম। তিনি বলেন, ইউরোপে যাওয়ার স্বপ্ন ছিল রনির। সেই সুযোগের কথা বলেই তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। কিন্তু সেখানে গিয়ে তিনি কার্যত বন্দি হয়ে পড়েছেন। মাঝে মাঝে সীমিত সময়ের জন্য ফোন ব্যবহার করতে দেওয়া হয়। সেই সুযোগে পাঠানো অডিও বার্তায় রনি জানিয়েছেন, তারা রাশিয়া-ইউক্রেন সীমান্তের কাছাকাছি অবস্থান করছেন এবং প্রতিদিন আতঙ্কের মধ্যে সময় কাটছে।
সৌরভ মোল্লার পরিবারও একই অভিযোগ তুলেছে। তার চাচি লিমা আক্তার সুখী জানান, সর্বশেষ ১৭ মে পরিবারের সঙ্গে কথা হয়েছিল সৌরভের। পরে ভিডিও কলে তাকে সামরিক পোশাকে দেখা যায়। সেই দৃশ্য দেখে পরিবারে আতঙ্ক আরও বেড়ে যায়।
ঘটনার পর পলাশ শেখের বাবা জামিল শেখ খিলক্ষেত থানায় লিখিত অভিযোগ করেছেন। তবে অভিযোগটি এখনো মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তিনি। পুলিশ তাদের আগে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেছে।
অন্যদিকে বিএমইটি জানিয়েছে, অভিযোগ গ্রহণে তাদের কোনো বাধা নেই এবং পুলিশের এই অবস্থান অযৌক্তিক।
এ ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনও নড়েচড়ে বসেছে। গোপালগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৌশিক আহমেদ জানিয়েছেন, বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে তাদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
গোপালগঞ্জের পুলিশ সুপার মো. হাবীবুল্লাহ বলেছেন, এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না পেলেও অভিযোগ পাওয়া গেলে স্থানীয় দালালদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, বিদেশে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার ঘটনা নতুন নয়। তবে যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে মানুষকে পাঠিয়ে জোরপূর্বক সামরিক কাজে ব্যবহার করার অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। অর্থনৈতিক সংকট, বেকারত্ব এবং দ্রুত বিদেশে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করেই এমন চক্র সক্রিয় হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে যাচাই-বাছাই ছাড়া কোনো এজেন্সির ওপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে মানবপাচার ও প্রতারণা রোধে কঠোর নজরদারি এবং দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ারও দাবি উঠছে।

