দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করেছে বাংলাদেশ। চলমান তাপপ্রবাহ ও গরমের মধ্যে বিদ্যুতের বাড়তি চাহিদা সামাল দিতে গিয়ে বুধবার রাত ৯টায় দেশে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের রেকর্ড গড়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এটিই এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘটনা।
সূত্রে জানা গেছে, এর আগে সর্বোচ্চ উৎপাদনের রেকর্ড ছিল ১৬ হাজার ৭৯৪ মেগাওয়াট, যা ২০২৫ সালের ২৩ জুলাই অর্জিত হয়েছিল। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাল দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই রেকর্ড শুধু উৎপাদনের পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের বিদ্যুৎ অবকাঠামো, সঞ্চালন সক্ষমতা এবং চাহিদার পরিবর্তিত বাস্তবতারও একটি প্রতিফলন।
বাংলাদেশে সাধারণত সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হয়। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে পরিস্থিতি আরও তীব্র হয়ে ওঠে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাসাবাড়িতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি ফ্যান, ফ্রিজ, পানির পাম্পসহ দৈনন্দিন বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির ব্যবহারও বেড়ে যায়।
বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ শতাংশই আসে আবাসিক খাত থেকে। অর্থাৎ বাসাবাড়িই এখন সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী।
শিল্প খাতও বিদ্যুৎ চাহিদা বৃদ্ধির অন্যতম বড় কারণ। তৈরি পোশাক শিল্প, বস্ত্রকল, ভারী শিল্প এবং উৎপাদনমুখী কারখানাগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিপুল পরিমাণ শক্তি প্রয়োজন হচ্ছে। মোট ব্যবহারের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ বিদ্যুৎ শিল্প খাতে ব্যয় হয়।
অন্যদিকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিপণিবিতান, অফিস ও হোটেল-রেস্তোরাঁ মিলিয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হয়। এছাড়া কৃষি, সেচ ও জনসেবামূলক কাজেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ প্রয়োজন হচ্ছে।
–এর তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। তবে বাস্তবে সব কেন্দ্র থেকে একসঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হয় না।
কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানি সরবরাহ সংকট, গ্যাসের ঘাটতি, কয়লা আমদানির অনিশ্চয়তা এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমের কারণে উৎপাদন অনেক সময় সীমিত হয়ে পড়ে। ফলে কাগজে-কলমে সক্ষমতা বেশি হলেও বাস্তব উৎপাদন চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করেই পরিচালনা করতে হয়।
বিদ্যুৎ খাত বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এই রেকর্ড উৎপাদন একদিকে যেমন দেশের সঞ্চালন ও উৎপাদন ব্যবস্থার সক্ষমতার ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে এটি বাড়তে থাকা বিদ্যুৎ নির্ভরতারও প্রতিফলন।
বাংলাদেশের নগরায়ন, শিল্পায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রা দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। বিশেষ করে শহরাঞ্চলে এসি ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ায় গরম মৌসুমে জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, শুধু উৎপাদনের রেকর্ড করাই যথেষ্ট নয়। দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যুৎ খাতকে টেকসই রাখতে সাশ্রয়ী জ্বালানি, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। অন্যথায় উৎপাদন বাড়লেও ব্যয় ও ভর্তুকির চাপ অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমানে দেশের বিদ্যুৎ খাত এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে চাহিদা দ্রুত বাড়ছে, কিন্তু সেই চাহিদা টেকসইভাবে পূরণ করতে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

