বিশ্ব শ্রমবাজার এখন দ্রুত দক্ষ জনশক্তির দিকে ঝুঁকছে কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখনো বিদেশে যাচ্ছে বেশি আধা দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে দেশের কর্মীরা। একই সঙ্গে কমছে আয় এবং বাড়ছে অভিবাসন ব্যয়।
দেশে দক্ষ জনশক্তি তৈরির জন্য সরকারি ১১০টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (টিটিসি) রয়েছে। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন উঠছে। অভিযোগ রয়েছে, অনেক কেন্দ্রেই আধুনিক কারিকুলাম নেই, নেই পর্যাপ্ত দক্ষ প্রশিক্ষক এবং আধুনিক যন্ত্রপাতিও সীমিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো এখনো আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী হয়ে উঠতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে পুরোনো সিলেবাস অনুসরণ করা হচ্ছে। ফলে প্রশিক্ষণ নিয়ে বিদেশে গিয়ে কাঙ্ক্ষিত চাকরি পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিসংখ্যান বলছে, টিটিসি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া প্রায় ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী বিদেশে প্রত্যাশিত চাকরি পান না। হাতে-কলমে শেখার সুযোগ কম থাকায় দক্ষতা অর্জনও পূর্ণাঙ্গ হচ্ছে না।
প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীন জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) পরিচালিত এসব টিটিসিতে আধুনিক প্রশিক্ষণের ঘাটতি স্পষ্ট। নতুন স্থাপিত অনেক কেন্দ্রেও পর্যাপ্ত জনবল নেই, ফলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ১১০টি টিটিসি নিয়ে একটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করে। সেখানে বলা হয়, এসব প্রতিষ্ঠানের কারিকুলাম মূলত দেশের স্থানীয় শ্রমবাজারকে কেন্দ্র করে তৈরি। কিন্তু বিদেশে বেশি রেমিট্যান্স আনতে হলে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ অপরিহার্য। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, কোন দেশে কী ধরনের কর্মী প্রয়োজন, সেই অনুযায়ী প্রশিক্ষণ এবং ভাষা শিক্ষা যুক্ত করা জরুরি।
অভিবাসন ও শরণার্থী বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, আইএলও প্রতিবেদনে টিটিসিগুলোর আন্তর্জাতিক মানের ঘাটতি স্পষ্ট হয়েছে। তার মতে, বর্তমান প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা বক্তৃতাভিত্তিক এবং আধুনিক দক্ষতা তৈরিতে অপ্রতুল। পাশাপাশি বিদেশের ভাষা শেখানোরও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই।
তিনি আরও বলেন, প্রশিক্ষক সংকট বড় সমস্যা। অনেক প্রশিক্ষকই যথাযথভাবে প্রশিক্ষিত নন এবং প্রযুক্তিগত দক্ষতাও সীমিত। ফলে প্রশিক্ষণার্থীরা বাস্তব কাজের জন্য প্রস্তুত হতে পারছেন না।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও রামরুর চেয়ারম্যান তাসনিম সিদ্দিকী সরকারি টিটিসিগুলোর অবস্থা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন। তার মতে, অনেক কেন্দ্রেই এখনো মৌলিক অবকাঠামো, আধুনিক সরঞ্জাম এবং পর্যাপ্ত প্রশিক্ষক নেই। কোথাও কোথাও সহায়ক কর্মী না থাকায় প্রশিক্ষণার্থীদের দিয়েই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করানো হয়, যা দক্ষতা উন্নয়নের পরিপন্থি।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার বলেন, বিশ্ব এখন দক্ষতা নির্ভর নিয়োগ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে। তাই সময়ের দাবি হলো দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, দেশের সব টিটিসির বাস্তব অবস্থা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে এখন দক্ষ কর্মীর চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে এখনো বেশি যাচ্ছে আধা দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক। রামরুর তথ্য অনুযায়ী, বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি কর্মীদের মাত্র ২০ থেকে ২২ শতাংশ দক্ষ। আর ৭০ থেকে ৭৪ শতাংশই আধা দক্ষ বা অদক্ষ। এই অসামঞ্জস্যের কারণে একদিকে আয় কমছে, অন্যদিকে বাড়ছে বিদেশ যাওয়ার খরচ।
বিএমইটির প্রশিক্ষণ ও পরিচালনা বিভাগের পরিচালক প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন জানান, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ যে কারিকুলাম দেয়, সেটির ভিত্তিতেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। বর্তমানে ১১০টি টিটিসি এবং ৬টি মেরিন টেকনোলজি ইনস্টিটিউটে মোট ৫৫টি ট্রেডে প্রশিক্ষণ চলছে। প্রতিবছর প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার প্রশিক্ষণার্থী এসব কেন্দ্র থেকে প্রশিক্ষণ নেন।
বাংলাদেশের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলোর দুর্বলতা, পুরোনো কারিকুলাম এবং দক্ষ প্রশিক্ষকের অভাবের কারণে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে দেশ পিছিয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরা দ্রুত সংস্কার ও আধুনিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার ওপর জোর দিয়েছেন।

