বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ককে আরও বিস্তৃত ও কার্যকর পর্যায়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উচ্চপর্যায়ের বৈঠক শেষে বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে দুটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি এবং ১৩টি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু একটি নিয়মিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক নয়; বরং ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন ভিত্তি তৈরি করার প্রচেষ্টা।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) স্থানীয় সময় বিকাল ৫টায় বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব পিপলে’ এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অপরদিকে চীনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্বে ছিলেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াং।
দুই দেশের সরকারপ্রধানের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা শেষে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার লক্ষ্যে মোট ১৫টি দলিলে স্বাক্ষর করা হয়। এর মধ্যে দুটি ছিল আনুষ্ঠানিক চুক্তি এবং বাকি ১৩টি ছিল সমঝোতা স্মারক।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ ও চীনের সম্পর্ক অর্থনৈতিক সহযোগিতা, অবকাঠামো উন্নয়ন, জ্বালানি, প্রযুক্তি, শিক্ষা এবং বাণিজ্য খাতে দ্রুত বিস্তৃত হয়েছে। নতুন এসব চুক্তি ও সমঝোতা ভবিষ্যতে সেই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা রাখবে।
বিশ্ব অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তার এই সময়ে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে চীনের মতো বৃহৎ অর্থনৈতিক শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর হওয়া দেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার জন্য ইতিবাচক বার্তা বহন করে।
বৈঠকে শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, আঞ্চলিক সহযোগিতা, বাণিজ্য সম্প্রসারণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন নিয়েও আলোচনা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাতে কার্যকর সহযোগিতা বাস্তবায়ন করা গেলে বাংলাদেশের উন্নয়ন যাত্রা আরও গতিশীল হতে পারে।
বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, পররাষ্ট্র উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির, অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ হাসান আল মাহমুদ তিতুমীর এবং শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা মাহাদী আমিনসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
অন্যদিকে চীনের পক্ষ থেকেও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেন, যা এই সফরের গুরুত্বকে আরও স্পষ্ট করে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, সাম্প্রতিক বৈশ্বিক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশ ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। চীনের সঙ্গে এই নতুন সহযোগিতা সেই নীতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে চুক্তি স্বাক্ষরের চেয়ে এগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হবে।
আগামী দিনগুলোতে এসব চুক্তি ও সমঝোতার আওতায় কী ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হয় এবং সেগুলো দেশের অর্থনীতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে কতটা প্রভাব ফেলে, সেদিকেই এখন সবার নজর থাকবে।
বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের ইতিহাসে বেইজিংয়ের এই বৈঠককে তাই অনেকেই নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে দেখছেন।

