রাজধানীর পল্লবীতে আট বছরের শিশু রামিসাকে ধর্ষণের পর নির্মম হত্যার ঘটনায় দায়ের হওয়া মামলায় আগামী ১ জুন থেকে বিচারিক কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। ওইদিন আদালতে আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানি হবে। বিচার সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, অভিযোগ গঠন সম্পন্ন হলে মামলাটির পূর্ণাঙ্গ বিচার শুরু হবে।
রোববার ঢাকার শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে মামলার অভিযোগপত্র গ্রহণ করা হয়। আদালতের বিচারক মাসরুর সালেকীন শুনানির জন্য নতুন দিন ধার্য করেন। এর আগে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পল্লবী থানার উপ-পরিদর্শক অহিদুজ্জামান আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন। সেখানে সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
পরে মহানগর হাকিম আদালত মামলাটি বিচারের জন্য শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর নির্দেশ দেন। তদন্ত শেষ হওয়ার পর অল্প সময়ের মধ্যেই অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়ায় মামলাটি নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা স্পষ্ট হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, নিহত রামিসা রাজধানীর একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। গত ১৯ মে সকালে বাসা থেকে বের হওয়ার পর তাকে পাশের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। কিছু সময় পর শিশুটিকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আশপাশে অনুসন্ধান শুরু করেন। একপর্যায়ে অভিযুক্তদের কক্ষের সামনে রামিসার জুতা দেখতে পেয়ে তাদের সন্দেহ হয়।
পরে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পান। কক্ষের ভেতরে শিশুটির মরদেহ পড়ে ছিল এবং বিচ্ছিন্ন মাথা একটি বালতির মধ্যে রাখা ছিল বলে তদন্ত নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ঘটনাটি সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযুক্ত নারীকে হেফাজতে নেয়। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পরদিন নিহত শিশুর বাবা পল্লবী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। গ্রেপ্তারের পর আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সোহেল রানা ঘটনার দায় স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা। জবানবন্দিতে সে দাবি করে, ঘটনার আগে মাদক গ্রহণ করেছিল।
তদন্তে উঠে এসেছে, শিশুটিকে প্রথমে ধর্ষণ করা হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কা থেকে তাকে হত্যা করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। মরদেহ বিকৃত করার অভিযোগও রয়েছে আসামির বিরুদ্ধে। তদন্ত কর্মকর্তাদের ভাষ্য, পুরো ঘটনার সময় অভিযুক্তের স্ত্রী একই কক্ষে উপস্থিত ছিলেন এবং অপরাধ সংঘটনে সহায়তা করেছেন বলে প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংস অপরাধের ঘটনায় দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ এ ধরনের ঘটনা সমাজে গভীর আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি করে। বিশেষ করে রাজধানীর মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ড অভিভাবকদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মাদকাসক্তি, মানসিক বিকার এবং সামাজিক অবক্ষয়ের সমন্বয়ে ভয়ংকর অপরাধ বাড়ছে। তারা মনে করছেন, শুধু শাস্তি দিলেই হবে না, একই সঙ্গে সামাজিক প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং স্থানীয় প্রশাসনকে আরও সতর্ক ভূমিকা নিতে হবে।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শিশুটির জন্য বিচার দাবি করে বিভিন্ন মহল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছে। অনেকেই বলছেন, শিশু নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় দ্রুততম সময়ের মধ্যে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করা গেলে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ কমে আসতে পারে।
মানবাধিকারকর্মীদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, সমাজজুড়ে সচেতনতা বাড়ানোও জরুরি। তারা বলছেন, প্রতিবেশী সম্পর্ক, পারিবারিক নজরদারি এবং সন্দেহজনক আচরণ দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো গেলে অনেক অপরাধ আগেই ঠেকানো সম্ভব।

