নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের জন্য ন্যায়বিচারের পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন এবং মানসিক সহায়তা নিশ্চিত করতে জাতীয় সংসদের অধীনে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের আহ্বান জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, অপরাধীদের বিচারের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে একটি কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
শুক্রবার ‘নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সমর্থনে আন্তর্জাতিক দিবস ২০২৬’ উপলক্ষে আয়োজিত ‘ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের অধিকার বিষয়ক জাতীয় সংলাপ’-এ এই আহ্বান জানানো হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। সংলাপের আয়োজন করে মানবাধিকারভিত্তিক সংগঠন ‘মায়ের ডাক’।
সভাপতির বক্তব্যে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, কোনো ব্যক্তি নির্যাতনের শিকার হলে শুধু অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়; একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, একটি মানবিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো ভুক্তভোগীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করা।
তিনি আরও বলেন, গুম, হত্যা ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতনের শিকার মানুষ এবং তাদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের দায়িত্ব রয়েছে। তাদের অধিকার সুরক্ষায় কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং সংসদীয় পর্যায়ে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করলে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম আরও সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে।
ডেপুটি স্পিকারের মতে, নির্যাতনের প্রভাব কেবল একজন ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পুরো পরিবার ও সমাজের ওপর পড়ে। অনেক পরিবার মানসিক ট্রমা, সামাজিক বৈষম্য এবং আর্থিক সংকটের মুখোমুখি হয়। তাই ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনকে কেবল আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে নয়, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অপরিহার্য উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।
তিনি ভুক্তভোগীদের জন্য আইনি সহায়তা সহজলভ্য করা, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কাউন্সেলিংয়ের সুযোগ বাড়ানো, উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ পাবেন।
সংলাপে আরও বলা হয়, নারীর প্রতি সহিংসতা, শিশু নির্যাতন, মানবপাচার, হেফাজতে নির্যাতনসহ বিভিন্ন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি জরুরি। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনগুলোকে এ ক্ষেত্রে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ জোরদার করা গেলে নির্যাতনের ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব বলেও মত দেন বক্তারা।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশ নির্যাতন প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছে। তবে এসব আইনের কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে পুনর্বাসন কর্মসূচির পরিধি বাড়ানোর ওপরও তিনি গুরুত্ব দেন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন এবং সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, গুম ও হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক ব্যক্তির প্রকাশ্য ও সুষ্ঠু বিচার হওয়া প্রয়োজন। তিনি জানান, গুমসংক্রান্ত তদন্ত কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দও অব্যাহত থাকবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি এবং তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও আশ্বাস দেন।
জাতীয় সংলাপে বিভিন্ন সংসদ সদস্য, নির্যাতনের শিকার ব্যক্তি ও তাদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী, বিচারক, শিক্ষাবিদ, উন্নয়নকর্মী, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির প্রতিনিধি, সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের জন্য একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর ক্ষতিপূরণ কাঠামো প্রণয়ন, পৃথক পুনর্বাসন তহবিল গঠন, আইনি সহায়তা আরও বিস্তৃত করা এবং ভুক্তভোগীবান্ধব বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাদের মতে, ন্যায়বিচারের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন বিচার প্রক্রিয়ার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার বাস্তব সুযোগ পাবেন।

