রাজধানীর ব্যস্ত জীবনে প্রতিদিনের মতোই অফিসে যাচ্ছিলেন মাহমুদুর রহমান। পথের মধ্যে দেখলেন একটি কুকুর একটি বিড়ালকে তাড়া করছে। প্রাণিপ্রেমী মানুষ হিসেবে তিনি এগিয়ে গিয়ে বিড়ালটিকে উদ্ধার করেন। কিন্তু সেই মানবিক কাজই শেষ পর্যন্ত তার জীবনের জন্য ভয়ংকর হয়ে দাঁড়ায়। আতঙ্কিত বিড়ালটি তাকে আঁচড় ও কামড় দিয়েছিল, যদিও তখন তিনি বিষয়টিকে গুরুত্ব দেননি। কয়েক সপ্তাহ পর হঠাৎ করেই পানির প্রতি অস্বাভাবিক ভয় ও অসহ্যতা তৈরি হয় তার মধ্যে। পরে হাসপাতালে পরীক্ষা করে জানা যায়, তিনি জলাতঙ্কে আক্রান্ত। কয়েক দিনের মধ্যেই মৃত্যু হয় তার।
এই ঘটনা শুধু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়, বরং দেশের বাড়তে থাকা জলাতঙ্ক পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ চিত্র। রাজধানীর মহাখালী সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল পর্যন্ত সোয়া তিন বছরে জলাতঙ্কে মারা গেছেন ১৭৫ জন।
পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৩ সালে মারা যান ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন, ২০২৫ সালে ৫৯ জন এবং ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ১৬ জন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সংখ্যা কেবল হাসপাতালভিত্তিক তথ্য। বাস্তবে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বাংলাদেশে জলাতঙ্ক পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ২০১৫ সালে এই রোগে মারা যান ৮৩ জন। এরপর ২০১৬ সালে ৬৬ জন, ২০১৭ সালে ৮০ জন, ২০১৮ সালে ৫৭ জন, ২০১৯ সালে ৫৭ জন, ২০২০ সালে ২৬ জন, ২০২১ সালে ৪০ জন এবং ২০২২ সালে ৪৫ জনের মৃত্যু হয়। অর্থাৎ বছরভিত্তিক ওঠানামা থাকলেও রোগটি এখনো বড় জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি হিসেবেই রয়ে গেছে।
চিকিৎসকদের মতে, সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো মানুষের অসচেতনতা। কুকুর বা বিড়ালের সামান্য আঁচড় কিংবা ছোট কামড়কে অনেকেই গুরুত্ব দেন না। অনেকে মনে করেন, রক্ত না বের হলে বিপদের কিছু নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জলাতঙ্ক ভাইরাস শরীরে প্রবেশের জন্য বড় ক্ষতের প্রয়োজন হয় না। আক্রান্ত প্রাণীর লালা সামান্য আঁচড়ের মাধ্যমেও শরীরে প্রবেশ করতে পারে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. শ্রীবাস পাল জানিয়েছেন, প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৭০০ মানুষ কুকুর বা বিড়ালের কামড়ের পর টিকা নিতে হাসপাতালে আসেন। শুধু রাজধানী নয়, দেশের বিভিন্ন এলাকাতেই বেওয়ারিশ কুকুরের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। একই সঙ্গে অনেক পরিবার এখন বাসায় কুকুর-বিড়াল পোষে। ফলে মানুষ ও প্রাণীর সংস্পর্শও আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলাতঙ্ক একবার শরীরে লক্ষণ তৈরি করলে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা প্রায় থাকে না। এটিকে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগগুলোর একটি হিসেবে ধরা হয়। কিন্তু আশার বিষয় হলো, সময়মতো টিকা নিলে এই রোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব।
সাধারণত কুকুর, বিড়াল, শেয়াল কিংবা বেজির কামড়ে জলাতঙ্ক ছড়ায়। আক্রান্ত প্রাণীর আচরণও অনেক সময় অস্বাভাবিক হয়ে যায়। তারা হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে বা অস্বাভাবিক আচরণ করে। তবে সব সময় তা বোঝা সম্ভব হয় না। তাই যেকোনো কামড় বা আঁচড়ের পর দ্রুত সাবান ও পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ধুয়ে নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন চিকিৎসকরা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু চিকিৎসা নয়, সমস্যার মূল সমাধান করতে হলে বেওয়ারিশ কুকুর নিয়ন্ত্রণ, প্রাণীর টিকাদান এবং জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই দেশে কুকুর নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের অভাব রয়েছে। ফলে শহর ও গ্রামে বেওয়ারিশ প্রাণীর সংখ্যা বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা আরও মনে করেন, জলাতঙ্ক প্রতিরোধে স্কুল, কলেজ ও গণমাধ্যমভিত্তিক সচেতনতা কার্যক্রম বাড়ানো জরুরি। কারণ অধিকাংশ মানুষ এখনো জানেন না যে, সামান্য আঁচড়ও মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
একসময় জলাতঙ্ক মানেই ছিল নিশ্চিত মৃত্যু। আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় এখনো রোগটি প্রাণঘাতী, তবে সচেতনতা ও দ্রুত টিকা নেওয়ার মাধ্যমে এটি পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই কুকুর বা বিড়ালের কামড় কিংবা আঁচড়কে কখনোই ‘সামান্য’ ভেবে অবহেলা করা উচিত নয়।

