ঈদুল আজহার আগে ভয়াবহ কালবৈশাখি ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে বরিশালের দ্বীপ উপজেলা মেহেন্দীগঞ্জ। ঝড়ের তাণ্ডবে শতাধিক ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, ভেঙে পড়েছে অন্তত ১০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি। গাছ উপড়ে সড়ক ও বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়ে থাকায় পুরো উপজেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন নদীবেষ্টিত এলাকার বাসিন্দারা।
বুধবার সকাল ১০টার দিকে আকস্মিকভাবে শুরু হওয়া ঝড় অল্প সময়ের মধ্যেই ভয়াবহ রূপ নেয়। প্রবল বাতাসে বিভিন্ন এলাকায় ঘরের চাল উড়ে যায়, গাছ ভেঙে পড়ে এবং বিদ্যুতের তার ছিঁড়ে যায়। সবচেয়ে বেশি ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে পৌর এলাকার চুনার গ্রাম, কালিকাপুর ও বদরপুর এলাকায়।
চুনার গ্রামে হানিফ পোদ্দারের বাড়ির ওপর একটি বড় চাম্বল গাছ ভেঙে পড়লে ঘরের বারান্দাসহ বেশ কয়েকটি অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কে দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে যাওয়ায় বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়েছে। পরিবারের দাবি, কয়েক সেকেন্ড দেরি হলে প্রাণহানির আশঙ্কা ছিল।
কালিকাপুর এলাকায় আরও মানবিক বিপর্যয়ের চিত্র দেখা গেছে। সেখানে শান্ত রাড়ির বসতঘরের ওপর একটি বড় নারিকেল গাছ পড়ে পুরো ঘরটি বিধ্বস্ত হয়ে যায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, পিতা-মাতা হারানো শান্ত ও তার বোন দাদীর সঙ্গে ওই ঘরেই বসবাস করতেন। মানুষের সহায়তায় চলা পরিবারটির একমাত্র আশ্রয় এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে তারা এখন অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বদরপুর গ্রামে ঝড়ে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে একটি মুরগির খামারও। খামারের টিন ও কাঠামো দুমড়ে-মুচড়ে যাওয়ায় আর্থিকভাবে বড় ক্ষতির মুখে পড়েছেন খামার মালিক।
ঝড়ের পর থেকে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে পুরো মেহেন্দীগঞ্জ। ভেঙে পড়া খুঁটি ও ছিঁড়ে যাওয়া তারের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ঈদকে সামনে রেখে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ আরও বেড়েছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের বাসিন্দারা খাদ্য সংরক্ষণ, পানি সরবরাহ ও দৈনন্দিন কাজ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সদস্যরা সকাল থেকেই রাস্তায় পড়ে থাকা গাছ অপসারণে কাজ করছেন। গুরুত্বপূর্ণ সড়ক সচল রাখতে তারা নিজ উদ্যোগে উদ্ধার কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
পল্লী বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ঝড়ে অন্তত ১০টি বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে গেছে। এছাড়া বহু স্থানে তার ছিঁড়ে পড়েছে এবং গাছ বিদ্যুৎ লাইনের ওপর পড়ে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। জরুরি ভিত্তিতে মেরামত কাজ শুরু হলেও পুরো পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগতে পারে। মূল লাইন মেরামত করা গেলে ধাপে ধাপে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানিয়েছে, ঝড়ের তীব্রতা এতটাই ছিল যে তাদের স্টেশন এলাকাতেও গাছ ও বৈদ্যুতিক খুঁটি ভেঙে পড়েছে। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
স্থানীয়রা বলছেন, নদীবেষ্টিত এই দ্বীপ উপজেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত অসহায় পরিবারগুলোর জন্য দ্রুত প্রশাসনিক সহায়তা, ত্রাণ ও পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এদিকে একই ঝড়ের প্রভাবে পাশের হিজলা ও মুলাদী উপজেলাতেও ঘরবাড়ি ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। আবহাওয়া পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত উপকূল ও নদীসংলগ্ন এলাকার মানুষকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

