কোরবানির মৌসুমে রাজধানীর সাইন্সল্যাব এলাকায় জমে উঠেছে পশুর চামড়ার বেচাকেনা। তবে বাজারে সরবরাহ বাড়লেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত দাম। উল্টো দামের বড় পতনে লোকসানে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। অনেকেই অভিযোগ করছেন, বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। ফলে চামড়ার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সংগ্রাহক ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা।
বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সাইন্সল্যাব এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, অস্থায়ী আড়তগুলোতে ট্রাক, পিকআপ, ভ্যান ও রিকশায় করে একের পর এক চামড়া এসে জমা হচ্ছে। এলাকাজুড়ে প্রায় ২০টি স্থানে চামড়া কেনাবেচা চললেও বাজারে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। প্রতি পিস গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৭০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হতে দেখা গেছে। তবে বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে দাম আরও কমে যায়।
মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাবি, বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা তুলনামূলক বেশি দামে চামড়া কিনে এনেছেন। কিন্তু রাজধানীতে এসে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। কেউ কেউ জানান, ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দরে চামড়া সংগ্রহ করলেও সাইন্সল্যাবে এসে ক্রেতারা ৫০০ টাকার বেশি দাম বলতে রাজি হননি।
একাধিক ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, বাজারে সক্রিয় কিছু ক্রেতা একই দামে চামড়া কিনতে চাওয়ায় প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে না। এতে বিক্রেতারা বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া ছেড়ে দিচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও লাভজনক দামে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, তারা লাখ লাখ টাকার চামড়া সংগ্রহ করেছেন। কিন্তু বাজারে এসে দেখছেন, অধিকাংশ ক্রেতা একই দামে চামড়া কিনতে চাচ্ছেন। এতে করে বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়া নিয়েও দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে। অনেকে সরকারের হস্তক্ষেপ দাবি করে বাজারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
তবে কিছু বিক্রেতা সীমিত পরিসরে সামান্য লাভ করতে পেরেছেন। বিশেষ করে স্থানীয়ভাবে কম দামে সংগ্রহ করা চামড়া বিক্রি করে কেউ কেউ প্রতি পিসে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত লাভের কথা জানিয়েছেন। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যবসায়ীর অবস্থাই ছিল হতাশাজনক।
বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, বিকেল পাঁচটার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে থাকে। কিছু স্থানে গরুর চামড়া প্রতি পিস মাত্র সাড়ে ৩০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বিক্রেতারা বাধ্য হয়ে কম দামে চামড়া ছেড়ে দেন। বিশেষ করে মাদ্রাসা ও এতিমখানা থেকে আনা চামড়ার ক্ষেত্রে এই চাপ বেশি ছিল।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কাঁচা চামড়া দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করা কঠিন। যথাসময়ে লবণ না দিলে এবং দ্রুত বিক্রি না হলে চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যায়। ফলে সন্ধ্যার পর থেকে দাম কমতে শুরু করে। গরম আবহাওয়া ও সংরক্ষণ সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা জানান, সরকার লবণযুক্ত চামড়ার জন্য মূল্য নির্ধারণ করলেও মাঠপর্যায়ে সেই দামের প্রতিফলন খুব কম দেখা যাচ্ছে। এ বছর ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে এই দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। এছাড়া খাসির চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, অতিরিক্ত সরবরাহ, ট্যানারিগুলোর সীমিত ক্রয়ক্ষমতা এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়ের অভাবে এবার চামড়ার বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। অনেক ট্যানারি এখনো পুরো সক্ষমতায় কেনাকাটা শুরু না করায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা চাপে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন, দ্রুত বাজার স্থিতিশীল করা না গেলে কোরবানির মৌসুমজুড়ে চামড়ার দামে আরও পতন হতে পারে। এতে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে এবং ভবিষ্যতে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এই খাত থেকে সরে যেতে পারেন।

