রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় অবহেলার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহত শিশুদের এক পরিবারের পক্ষ থেকে রমনা থানায় করা এ মামলাকে কেন্দ্র করে হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থা ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, বুধবার রাতে দায়ের করা মামলায় হাসপাতালের অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বে অবহেলার কারণে নবজাতকদের মৃত্যুর অভিযোগ আনা হয়েছে। ঘটনার বিভিন্ন দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঢাকা মহানগর পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, মামলায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আশিক ইকবাল জানান, পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে মামলা গ্রহণ করা হয়েছে। তদন্তের স্বার্থে হাসপাতালের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলা হবে এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্র যাচাই করা হবে।
এর আগে বুধবার ভোরে হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। শিশুদের বয়স ছিল মাত্র এক থেকে তিন দিনের মধ্যে। হঠাৎ একই ওয়ার্ডে এতগুলো মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে শোকের পাশাপাশি ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়ে।
নিহত শিশুদের পরিবারের অভিযোগ, ওয়ার্ডে দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ ছিল এবং পর্যাপ্ত তদারকির অভাব ছিল। তাদের দাবি, গরম ও বদ্ধ পরিবেশে নবজাতকদের শ্বাসকষ্ট তৈরি হতে পারে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় গাফিলতির কারণেই এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ জানায়নি। যদিও তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তবু চিকিৎসাগত ব্যাখ্যা বা কারিগরি ত্রুটির বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, মৃত নবজাতকদের মরদেহ বুধবার রাতেই পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। স্বজনেরা ময়নাতদন্তে আগ্রহ না দেখানোয় লিখিত আবেদনের ভিত্তিতে মরদেহ বুঝিয়ে দেওয়া হয়। শিশুদের বয়স খুব কম হওয়ায় পরিবারগুলো দ্রুত দাফনের সিদ্ধান্ত নেয়।
এ ঘটনার পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। তদন্তে হাসপাতালের পরিবেশ, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বে থাকা কর্মীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হবে বলে জানা গেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নবজাতক ওয়ার্ডে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, অক্সিজেন সরবরাহ, পরিচ্ছন্নতা ও নিবিড় পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব ক্ষেত্রে সামান্য ত্রুটিও নবজাতকের জন্য প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যু রাজধানীর স্বাস্থ্যসেবাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু তদন্ত কমিটি গঠন নয়, দেশের হাসপাতালগুলোতে নবজাতক পরিচর্যা ব্যবস্থার মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।

