রাজধানীর আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে একসঙ্গে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়েছে সরকার। তদন্ত প্রতিবেদনে গাফিলতি বা অবহেলার প্রমাণ মিললে হাসপাতালটির বিরুদ্ধে সব ধরনের আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন।
বৃহস্পতিবার সকালে নরসিংদীর মনোহরদীতে ঈদুল আজহার নামাজ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী জানান, মর্মান্তিক এ ঘটনার তদন্তে ইতোমধ্যে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তাদের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, ঈদের আনন্দের মধ্যেও আদ্-দ্বীন হাসপাতালের শিশু মৃত্যুর ঘটনা গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে। তিনি জানান, প্রাথমিকভাবে পাওয়া তথ্যে ধারণা করা হচ্ছে, একটি মায়ের অনুরোধে শিশু ওয়ার্ডের শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরে সেখানে গ্যাস লিকেজের মতো কোনো সমস্যা তৈরি হয়ে থাকতে পারে। তবে প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে জানান তিনি।
মন্ত্রী বলেন, ঘটনাটি জানার পরপরই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়। সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের পরিবেশ, যন্ত্রপাতির কার্যকারিতা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
গত বুধবার ভোরে রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পোস্ট ডেলিভারি ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। শিশুদের বয়স ছিল মাত্র এক থেকে তিন দিনের মধ্যে। একসঙ্গে এত নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের মধ্যে শোক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।
পরিবারগুলোর অভিযোগ, ওয়ার্ডে অব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা বন্ধ থাকার কারণে নবজাতকদের শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন জটিলতা তৈরি হতে পারে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত মৃত্যুর নির্দিষ্ট কারণ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করেনি।
এদিকে, এ ঘটনায় রমনা থানায় অবহেলাজনিত মৃত্যুর অভিযোগে মামলাও হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানিয়েছে, ঘটনার সব দিক তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী একই অনুষ্ঠানে দেশে হামের পরিস্থিতি নিয়েও কথা বলেন। তিনি দাবি করেন, সরকার সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে হাম পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারত। তার মতে, বর্তমানে পর্যাপ্ত টিকা মজুত রয়েছে এবং প্রতিটি শিশুকে টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
মন্ত্রী বলেন, হামে আক্রান্ত শিশুদের সংস্পর্শ থেকে সুস্থ শিশুদের দূরে রাখতে পারলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। ইতোমধ্যে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা কিছুটা কমেছে বলেও দাবি করেন তিনি। ঈদের পর পরিস্থিতি আরও উন্নতির আশা প্রকাশ করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, একদিকে হাম পরিস্থিতি, অন্যদিকে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় নিরাপত্তা ও অব্যবস্থাপনার অভিযোগ—দুটি বিষয়ই দেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য বড় সতর্কবার্তা। তারা বলছেন, শুধু তদন্ত কমিটি গঠন করলেই হবে না, হাসপাতালগুলোতে নবজাতক পরিচর্যা, জরুরি সেবা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার মানও কঠোরভাবে নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে জবাবদিহি ও মান নিয়ন্ত্রণ কার্যকর না হলে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে। তাই দ্রুত ও স্বচ্ছ তদন্তের পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

