সারা দেশে যখন ঈদুল আজহার আনন্দে ঘরে ঘরে উৎসবের আমেজ, তখন অনেক পরিবারের জন্য এবারের ঈদ হয়ে উঠেছে দুঃসহ এক বাস্তবতার নাম। কোথাও কোরবানির আনন্দ, নতুন পোশাক আর আত্মীয়স্বজনের আনাগোনা—আবার কোথাও হাসপাতালের ওয়ার্ডজুড়ে উৎকণ্ঠা, কান্না আর অনিশ্চয়তা। হামের ভয়াবহ সংক্রমণে অসংখ্য পরিবার এবার ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
রাজধানীর শিশু হাসপাতালসহ বিভিন্ন চিকিৎসাকেন্দ্রে ঈদের দিন দেখা গেছে ভিন্ন এক চিত্র। বাইরে উৎসবের ব্যস্ততা থাকলেও হাসপাতালের ভেতরে উদ্বিগ্ন অভিভাবকদের দীর্ঘ অপেক্ষা। অসুস্থ শিশুদের কেউ স্যালাইন নিয়ে শুয়ে আছে, কেউ অক্সিজেন সহায়তায় চিকিৎসা নিচ্ছে। ঈদের দিনটিও তাদের কাটছে হাসপাতালের বেডে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছে ৮২৫ শিশু। এর আগের কয়েক দিনেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল উদ্বেগজনক। সোমবার ১৭ জন, মঙ্গলবার ১০ জন এবং বুধবার পাঁচজন শিশুর মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছিল স্বাস্থ্য বিভাগ।
এ পর্যন্ত দেশে হাম ও হামের উপসর্গে মোট ৫৬৫ শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া হামে মারা গেছে ৮৮ শিশু। আর উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৪৭৭ জন। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে আক্রান্ত হয়েছে ৮ হাজার ৮৮৫ শিশু এবং উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছে ৫৪ হাজার ১৮২ জন।
চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় হাসপাতালগুলোতে চাপ বাড়ছে। বিশেষ করে যেসব শিশু আগে থেকে অপুষ্টি বা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় ভুগছিল, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি। অনেক শিশুকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হচ্ছে।
হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলো ঘুরে দেখা গেছে, অনেক অভিভাবক দিনের পর দিন ঘুমহীন অবস্থায় সন্তানের পাশে সময় কাটাচ্ছেন। ঈদের নতুন পোশাক, ঘুরতে যাওয়া কিংবা পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি—সবকিছু থেমে গেছে হাসপাতালের চার দেয়ালের মধ্যে। এখন তাদের একটাই চাওয়া, সন্তান যেন দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারে।
এক মা জানান, ঈদের সকালে সন্তানকে নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। পরিবারের সবাই ঈদের নামাজ ও কোরবানির প্রস্তুতিতে ব্যস্ত থাকলেও তার পুরো সময় কাটছে শিশুর চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগে। আরেক অভিভাবক বলেন, সন্তানের জ্বর ও শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকায় ঈদের আগের রাতেই হাসপাতালে আসতে হয়েছে। এরপর থেকে হাসপাতালেই কাটছে পুরো পরিবার।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঈদের দিনও নতুন রোগী ভর্তি হওয়া বন্ধ হয়নি। বৃহস্পতিবার নতুন করে আরও দুই শিশুকে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসকেরা বলছেন, সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত সতর্কতা অব্যাহত রাখতে হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সময়মতো টিকা না নেওয়া, সচেতনতার অভাব এবং আক্রান্তদের দ্রুত আলাদা না করার কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। তারা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক রোগ হওয়ায় শিশুদের নিরাপদ রাখতে পরিবার ও সমাজ—উভয় পর্যায়েই সতর্কতা বাড়ানো জরুরি।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, শিশুদের জ্বর, শরীরে লালচে দানা, কাশি বা চোখ লাল হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নিতে হবে। একই সঙ্গে আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
ঈদের আনন্দের মধ্যেও হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকা অসুস্থ শিশু আর উদ্বিগ্ন বাবা-মায়ের মুখ যেন দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতির এক কঠিন বাস্তবতাই সামনে এনে দিয়েছে। অনেক পরিবারের কাছে এবার ঈদ মানে উৎসব নয়, বরং সন্তানের জীবন ফিরে পাওয়ার অপেক্ষা।

